Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 13
সামিট পুশ ও কিলিমানজারো জয়
ঘুমের মধ্যেই মনে হচ্ছিল যেন চারদিকে কোনো বাজনা বেজে চলেছে। ঘুমের মধ্যেই নিজেকে প্রশ্ন করছি - কোনো উৎসবের প্রস্তুতি চলছে না কি? কিসের এই উৎসব? আমাদের তাতে যোগ দিতে হবে না কি? যোগ না দিতে হলেই ভালো। কারণ শরীর চাইছে না যে এখন ঘুম থেকে উঠি। আরেকটু বিশ্রাম প্রয়োজন। এসব চিন্তার মধ্যেই ফের ঘুমিয়ে পড়ি আবার টুংটাং আওয়াজে ফের ঘুম ভেঙ্গে যায়। পুরোপুরি ঘুম ভাঙতেই হেডল্যাম্প জ্বেলে সময় দেখলাম - রাত এগারটা। অর্থাৎ আমাদের হিসাবে তখনো এক ঘণ্টা ঘুমাতে পারবো। এটা ভেবে হেডল্যাম্প বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে একপ্রকার জোর করেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
রাত বারোটার দিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। যদিও অ্যান্টিপাসের ঘুম থেকে জাগানোর কথা ছিল। নিয়াজ তখনো ঘুমাচ্ছেন। তাকে এবার জাগালাম।
বললাম, উঠুন, বারোটা বেজে গেছে।
শুনে তিনি ধড়মড় করে উঠে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিসের বারোটা বেজে গেছে?
তার অবস্থা দেখে হাসি পেল। বললাম, ঘড়িতে বারোটা বাজে। সামিট পুশে যাবেন না? উঠে তৈরি হয়ে নিন।
এবার তিনি ধাতস্থ হলেন। বললেন, ওহ! আমি তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম।
অ্যান্টিপাস এর মধ্যে এসে নাম ধরে ডাকছেন।
তাকে বললাম, আমরা ইতিমধ্যেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছি। তোমরা প্রস্তুত?

উত্তরে অ্যান্টিপাস জানালেন যে তাদের সব প্রস্তুতি শেষ। এখন আমরা খেয়ে নিলেই রওয়ানা হতে পারবো।
এ পর্যায়ে একটা জিনিস ভেবে ভালো লাগছিল যে কারো শরীরেই কোনো ধরনের মাউন্টেন সিকনেস দেখা দেয় নি। চোখমুখ ফুলে যায় নি। কোনো মাথা ব্যথা নেই। কোনো সমস্যাও বোধ করছি না শুধু ঠান্ডাটা ছাড়া। ফলে এক ধরনের স্বস্তিবোধ ছিল। অবশ্য মাত্র ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় কোনো ধরনের উচ্চতাজনিত শারীরিক অসুস্থতা হলে সেটাই হতো আশ্চর্যের বিষয়। কারণ এই মাচামি রুটে আজ পর্যন্ত যে পরিমাণ উচ্চতা পার হয়ে ফের নিচে নেমেছি, তাতে শরীর পুরো অ্যাক্লেম্যাটাইজড হয়ে থাকার কথা।
পুরো জামাকাপড় পড়ে পায়ে জুতা গলিয়ে তাঁবুর বাইরে বের হতেই জ্যোৎস্নার রোশনাইয়ে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। হেডল্যাম্পের আলো ছাড়াই হাঁটা যায়, এতো আলো। মূলত, আমরা তখন রয়েছি পনের হাজার ফুট উচ্চতায়। সুতরাং বাংলাদেশের প্রায় সমুদ্র সমতলের তুলনায় সে সময়ে চাঁদের প্রায় পনের হাজার ফুট কাছাকাছি রয়েছি। যদিও মহাজাগতিক দূরত্বের তুলনায় সেটা খুবই কম, কিন্তু এটাই যেন চাঁদকে অনেক কাছে এনে দিয়েছে। আর বাতাস একেবারে প্রায় নির্ভেজাল থাকায় আলো একেবারে কোনোরকম ফিল্টার না হয়েই চলে আসছে বারাফু ক্যাম্পে, আমাদের কাছে। সে কারণেই চাঁদকে এতো কাছে মনে হচ্ছে। চাঁদের দিকে তাকানো পর্যন্ত যাচ্ছে না। এতই উজ্জ্বল সে চাঁদ।

মনে পড়ছিল এভারেস্ট অভিযানে সামিট পুশের কথা। ২০১০ সালের ২৩ মে ভোররাতে প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার ফুট উচ্চতায় থেকে চাঁদের তাকিয়ে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল। যেন প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এতই আলো ছিল মাত্র অর্ধেক সেই চাঁদে।
কিন্তু সব মানুষ গেল কই? ঘণ্টাখানেক আগেও তো পুরো ক্যাম্পজুড়ে পর্বতারোহী ও গাইডদের শোরগোল শুরু হয়েছিল। এখন তো ফের পিনপতন নিরবতা। তারা সব গেলেন কোথায়? এবার আমাদের তাঁবু এলাকার সামনের বোল্ডারের ওপাশে গিয়ে দেখলাম যে বারাফু ক্যাম্প থেকে কিলিমানজারো চূড়ায় যাওয়ার জন্য রুট ধরে পর্বতারোহীদের যেন ঢল নেমেছে। তাদের হেডল্যাম্পের মিটমিট করে জ্বলা আলো দেখে মনে হচ্ছে যেন পুরো রুটে জোনাকি পোকা সার বেধে এগিয়ে চলছে। হঠাৎ করেই তারা বড় কোনো বোল্ডারের আড়ালে হারিয়ে গিয়ে ফের খোলা আকাশের নিচে হাজির হচ্ছেন।

ডায়নিং টেন্টে গিয়ে ঢুকলাম। চা, পানি আর এক থাল বিস্কুট দেয়া হয়েছে সামিট পুশের আগে প্রস্তুতিমূলক খাবার হিসাবে। খাবার খুব একটা আগ্রহ নেই। কিন্তু খালি পেটে যাত্রা শুরু করাটা কোনো কাজের কথা নয়। আর পথে কোথায়, কখন, কতোটুকু, কোন খাবার খেতে পাবো, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই যতোটা সম্ভব বিস্কুট, চা আর পানি খেয়ে নিলাম।
ডাউন জ্যাকেটের পকেটে এবার বেশ কয়েকটা চকোলেট ভরে নিলাম যাতে সেগুলো শরীরের ওমে স্বাভাবিক থাকে, অতিরিক্ত ঠান্ডায় পাথরের মতো শক্ত না হয়ে যায়। আর ঘাড়ে ক্যামেরার ব্যাগ ঝুলিয়ে ব্যাগটিকে পিঠের দিকে পাঠিয়ে দিলাম। যাতে সামনের দিক থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস সরাসরি ক্যামেরায় এসে না লাগে এবং এর ফলে ক্যামেরার ব্যাটারি ক্ষয়ে না যায়। তার ওপর উইন্ডব্রেকার জ্যাকেট চাপিয়ে নিলাম।

সব প্রস্তুতি শেষ। এবার রওয়ানা দেয়ার পালা। সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম, রেডি? নিয়াজ, আর্নি, অ্যান্টিপাস - সবাই ইশারায় জানালেন যে তারা প্রস্তুত। যদিও এ পর্যায়ে সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, তারপরও একদফা বলে নিলাম। ?আমরা যে অভিযানে চলেছি, আজ রাতে তার চূড়ান্ত পর্যায়। এতো দিনের চমৎকার টিমওয়ার্কের ফলে সবাই সুস্থ দেহেই বারাফু ক্যাম্প পর্যন্ত এসে পৌঁছেছি। এর জন্য সাপোর্ট টিমের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। যদিও একজন সদস্য অসুস্থ হয়ে মোশি ফিরে গেছেন। কিন্তু সবার আগে ?সেফটি ফার্স্ট?। এই বিষয়টিও আমরা এই শেষ ধাপে অনুপুক্সক্ষ মেনে চলবো। নিজেদের যেকোনো সমস্যা সবাইকে জানাবো, কোনো কিছুই লুকিয়ে-ছাপিয়ে চলবো না। দলের সদস্যদের প্রয়োজনে যে কোনো ধরনের আত্মত্যাগ করতে কেউই পিছপা হবো না। যেহেতু আর্নি আর অ্যান্টিপাস শেষ ধাপে দলের সহযোগিতার জন্য পুরো প্রস্তুত রয়েছেন - আয়োজনের দিক থেকে এবং মানসিকভাবে, তাই তাদের কাছে ফের অনুরোধ যে পর্বতারোহীদের প্রয়োজনটাকে তারা যেন অগ্রাধিকার দেন। যেহেতু আমরা এখানে নতুন, এবং যেহেতু আর্নি ও অ্যান্টিপাসের এই অভিযানে আসার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, কাজেই তারা যেন আমাদেরকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন। যা এতোদিন তারা করে এসেছেন। আশা করছি দলবদ্ধভাবে আমরা বাংলাদেশের পতাকা আফ্রিকার সর্বোচ্চ বিন্দু কিলিমানজারো পর্বতের চূড়ায় ওড়াতে পারবো। বাংলাদেশ থেকে সেভেন সামিট অভিযান পরিচালনা করে বিশ্বের সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বত চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা পৌঁছানোর যে ঘোষণা ২৬ নভেম্বর ২০১০ তারিখে দিয়েছিলাম, সেই স্বপ্ন পূরণে আমরা একধাপ এগিয়ে যেতে পারবো। সবাই প্রস্তুত??

প্রস্তুত - সমস্বরে জানালেন সবাই। এবার সবার সামনে রইলেন আর্নি। তাকে অনুসরণ করছেন নিয়াজ, তার পেছনে অ্যান্টিপাস ও আমি। চার জনের দল। একাট্টা, স্বপ্ন পূরণের অভিলাষে বলীয়ান, নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে তৎপর। ঘড়িতে তখন সময় মধ্যরাত পেরিয়ে সোয়া একটা।
তখন মনে হতে থাকে যে এগারটার দিকে যারা সামিট পুশ শুরু করেছেন, তারা প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ এগিয়ে রয়েছেন। এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসাবে সামনে চলে আসে। কিন্তু সেটা নিয়ে না ভেবে পথের ওপর চোখ রাখায় মনোনিবেশ করলাম।

এরপর একটানা পথচলা। ক্যাম্প এলাকাটা মোটামুটি সাবলীলভাবে ঢালু। কিন্তু এটা শেষ হতেই পর্বতের গা তীক্ষ্ণ ঢালু। সেই ঢাল বাইতে গিয়ে ত্রিশ-চল্লিশ কদম পরেই হাফ ধরে যায়। বুক অনেক বেশি ওঠানামা করতে থাকে। সেটাকে উপেক্ষা করে না থেমে এগোতে থাকি। তখন সার বেধে এগিয়ে চলা জোনাকি পোকার দলকে একবার বোল্ডার বা কোনো রিজের আড়ালে হারিয়ে গিয়ে ফের দৃষ্টিসীমায় উপস্থিত হতে দেখছিলাম। চাঁদ তখন পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। কিন্তু তার পরও জ্যোৎস্নায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। সেই অপার্থিব আলোয় পর্বতের বিভিন্ন রিজ, বোল্ডার ইত্যাদির বিভিন্ন পরাজাগতিক চেহারায় সামনে হাজির হয়।
সামান্য বাতাস বয়ে চলছিল। কিন্তু তাতেই যেন একটু কুপোকাৎ। ঠান্ডা যেন জুতা ভেদ করে পায়ের তলায় গিয়ে পৌঁছাতে চাইছে। শরীরের ওপরের অংশে সেই ঠান্ডা তেমন সুবিধা করতে না পারলেও নিচের অংশে বেশ ঝামেলা তৈরি করছে। একটানা ঠান্ডায় যেন ম্রিয়মাণ সব অনুভূতি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠান্ডা কারণে পায়ের আঙ্গুলে ব্যথা শুরু হলো। এ সময় কোথাও না থেমে একটানা চড়াই পার হচ্ছি।

প্রায় দু?ঘণ্টা একটানা চলে অগ্রগামী সারির সবার পেছনে থাকার দলের দেখা পেয়ে গেলাম। তখন নিজের ওপর আস্থা ফিরে এসেছে। তাহলে খারাপ এগোই নি এতোক্ষণ! এর মধ্যেই একটা দলকে ফিরে যেতে দেখা গেল। সে দলে মাত্র একজন মহিলা পর্বতারোহী। তিনি খুব বেশি সুস্থ বোধ করছিলেন না। তাই তাকে নিয়ে সহযোগী গাইড ফিরে চলেছেন ক্যাম্পে। কিছুক্ষণ পর অগ্রবর্তী একটা দলকে ঢালে থেমে পানি পানের বিরতি নিতে দেখা গেল। বেশ বড়সড় একটা দল। আমরা তাদেরকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চললাম।
এই খাড়া তীক্ষ? ঢালের পুরো পথে শুধু নুড়ি পাথর। তাতে পা দেবে যায়। ফলে এক পদক্ষেপে যতোটুকু এগোনো সম্ভব, তা হচ্ছে না। এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় ?সিস্টেম লস? হচ্ছেই। এভাবে আরও প্রায় ঘণ্টা দেড়েক এগিয়েছি এবং বহু দলকে পিছনে ফেলে গেছি। ফলে আমাদের দলের আত্মবিশ্বাস তখন তুঙ্গে। কারণ এখন পর্যন্ত কেউই আমাদেরকে পার হয়ে যায় নি। আমরাই বরং প্রায় বিশটি দলকে অতিক্রম করে এসেছি। এর মধ্যে বার দুয়েক থামা হলো। একবার চকোলেট খেয়ে শরীরে শক্তি যোগানোর বিরতি। আরেকবার পানি পানের বিরতি। কিন্তু থামলেই মৃদু বয়ে চলা ঠান্ডা বাতাসে শরীর যেন হিম হয়ে আসে। তখন শরীর গরম রাখার নিজ তাগিদেই এগিয়ে যাই।

কিছুক্ষণ পর সামনের আরেক দলকে থেমে সদস্যদের একজন আরেকজনকে সুশ্রুষা করতে দেখলাম। ঘটনাটা হলো পর্বতারোহণের সম্যক অভিজ্ঞতা না থাকায় অভিযানের এ পর্যায়ে কি ধরনের পোশাক পরে আসা উচিত, তা জানা ছিল না। ফলে এক মহিলা পর্বতারোহী সাধারণ কাপড়ের ওপর গায়ে শুধু উইন্ডব্রেকার জ্যাকেট ও প্যান্ট চাপিয়ে এই চড়াই পার হচ্ছিলেন। কিন্তু ঠান্ডায় তিনি এ পর্যায়ে একেবারে কাবু হয়ে পড়েছেন। সঙ্গী পবর্তারোহী তার পিঠ একটানা ঘষেই চলেছেন, যাতে ঘর্ষণের মাধ্যমে শরীর একটু উষ্ণ হয়। কিন্তু ওই উচ্চতায় যে সামান্য বাতাস বইছে, তা সেই পদ্ধতি মানবে কেন? ফলে সেই মহিলা পর্বতারোহীর শরীরও আর প্রয়োজনীয় মাত্রায় উষ্ণ হচ্ছে না।
ততোক্ষণে চাঁদ পুরোই ডুবে গেছে। ফলে হেডল্যাম্পের আলোই তখন ভরসা। এর মধ্যে বহু দলকে পেছনে ফেলে এগিয়েছি। কিন্তু তখনও আরও জোনাকির দলকে সামনে এগিয়ে যেতে দেখলাম।

এভাবে ক্রমাগত চড়াই পার হয়ে চলেছি। সময়ের কোনো জ্ঞান তখন নেই। এবার কোথা থেকে গোঙানির আওয়াজ পাচ্ছি মনে হলো? ভুল শুনছি না তো? সামিট পুশের এই পর্যায়ে ততোক্ষণ পর্যন্ত আলগা নুড়িময় ট্রেইল পার হওয়ার খসখস আওয়াজ, ওয়াকিং স্টিক পাথরের ওপর পড়ে সৃষ্ট টুংটাং আওয়াজ এবং একেবারেই প্রয়োজন না হলে পর্বতারোহী ও গাইডদের মধ্যকার কথাবার্তার আওয়াজই ছিল প্রাধান্য বিস্তারকারী। আর মাঝে মধ্যে মৃদু হাওয়ায় খানিকটা জোর লাগলে সেটা হঠাৎ গায়ে আছড়ে পড়লে তাতে উইন্ডব্রেকার জ্যাকেটের যে প্রতিবাদ, সেটাই এতোক্ষণ শুনে এসেছি। কিন্তু কান্নার আওয়াজ কেন? এখানে কাঁদতে বসল কে?
যতোই এগিয়ে চলেছি, সেই কান্নার আওয়াজ আরও স্পষ্ট ও জোরালো হচ্ছে। তার মানে ভুল শুনি নি। সত্যিই কেউ কাঁদছেন। সেই আওয়াজ প্রকৃতির নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতাকে যেন কুটিকুটি করে ছিড়ে ফেলছে। শুন্যতার মাঝে যেন তা ড্রাম পেটানো আওয়াজের মতো মনে হচ্ছে। একেবারে কাছে উপস্থিত হতেই অগ্রবর্তী দলের এক মহিলা সদস্যকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখলাম। ঘটনা কি? জানা গেল যে সামিট পুশের সময়ে এই তীক্ষ্ণ ঢাল বেয়ে ওঠার যে কষ্ট, সেটা তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আর কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে তিনি কাঁদতে বসেছেন।

এই পরিস্থিতিতে হতভম্ব হয়ে নিজের কর্তব্যের কথা, লক্ষ্যের কথা যেন তখন ভুলতে বসেছি। আসলে তখন পুরো ঘটনায় যেন কেউই নিজের ভেতর নেই। পর্বতারোহণে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আগে কখনোই হই নি। ফলে ঘটনার আকস্মিকতায় যেন হকচকিয়ে গেছি। আর্নি এ পর্যায়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলার তাগাদা দিতেই বাস্তবে ফিরে এলাম। তখন আবার চড়াই পার হচ্ছি।
এ পর্যায়ে নিয়াজ জানালেন যে তার ?হেলুসিনেশন? হচ্ছে। তিনি ঠিকঠাক পা ফেলতে পারছেন না। কিছুক্ষণ পরপরই বিশ্রাম নিতে চাইছেন। ফলে আগের গতিতে আর এগোনো যাচ্ছে না।
তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কি ধরনের সমস্যা বোধ করছেন? মাথা ব্যথা নেই তো?
উত্তরে তিনি বললেন, বাতাসে অক্সিজেন কম থাকার কারণে হয়তো তার হেলুসিনেশন হচ্ছে। তিনি ঠিকঠাক সবকিছু ঠাহর করতে পারছেন না। বিশ্রাম নিলে সেটা ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা। আর যেহেতু তার পেশাদার ম্যারাথন দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে, কাজেই তিনি এ ধরনের কঠিন অভিযানের চরম পর্যায়গুলোর সঙ্গে পরিচিত। ফলে লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি পুরোই ওয়াকিবহাল। এখন শুধু একটু বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরঘুর করছিল - সেফটি ফার্স্ট। এর কোনো বিকল্প নেই, কোনো প্রতিস্থাপক নেই। দলের সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তবেই ফের চড়াই পার হবো, নয়তো না।
একটু পর মোয়েঞ্জি পর্বতের উচ্চতায় এসে হাজির হয়েছি। কিন্তু সেই নিকষ অন্ধকারের মধ্যে মোয়েঞ্জি পর্বত তো চোখে পড়ার কথা নয়। তাহলে? তখন হঠাৎ করেই পূব দিগন্তে পরিবর্তন লক্ষ করছিলাম। নিকষ অন্ধকারের বুক ভেদ করে যেন আলোর সঞ্চার হচ্ছে! ধীরে ধীরে পূব আকাশ ফরসা হয়ে আসছে। তখনো সূর্য ওঠে নি। কিন্তু মেঘের ভেলাকে দেখলাম পুরো পূব আকাশ ছেয়ে আছে এবং তা আমাদের উচ্চতার নিচে। মনে হচ্ছিল যেন সেই মেঘ বিছানো পথ বেয়ে সহজেই সূর্যের বাড়ি যাওয়া যাবে। কোনো কিছুই আটকিয়ে রাখতে পারবে না। একেবারে সাবলীল সেই মেঘ বিছানো পথ।
তখনো বেশ কয়েকবার নিয়াজ বললেন তার হেলুসিনেশন হওয়ার কথা। সেই সঙ্গে মিনিটখানেকের বিশ্রাম চাইছিলেন। তার অবস্থা খুব বেশি আশঙ্কাজনক কি না, জিজ্ঞেস করাতে তিনি আমাদের নির্ভার হওয়ার পরামর্শ দিলেন। আর আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি এই মনে করে যে তখন পর্যন্ত কোনো শারীরিক সমস্যা আমার হয় নি। শুধুমাত্র পানির তেষ্টা অনুভব করছিলাম যা পানি দিয়েই মেটানো সম্ভব হচ্ছিল।

এর মধ্যেই পর্বতারোহীদের দল সেই তীক্ষ? ঢাল বেয়ে ওপরের দিকে চলেছেন। এবার তাদের আরোহণের ক্ষণটুকু ক্যামেরায় তুলে নিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে সূর্যও উঁকি দিতে শুরু করল। এবার পুরো থেমে সেই সূর্যোদয় ক্যামেরাবন্দী করলাম। ফলে বেশ কয়েক মিনিট মূল্যবান সময় নষ্ট হলো। তাতে আর্নির আপত্তি। তিনি বারবার তাড়া দিলেন চূড়ার দিকে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আবার কবে দেখব? কাজেই আর্নির আপত্তি খুব বেশি ধোপে টিকল না। সময় নষ্ট হলেও ক্যামেরা ব্যস্ত থাকল কিছুক্ষণ।
এবার মারাঙ্গু রুট ধরে আসা পর্বতারোহীদের চোখে পড়ছে। তারাও সংখ্যায় অনেক। তাদের দিক থেকেও যেন পর্বতারোহী ও গাইডদের মিছিল নেমেছে। মাচামি ও মারাঙ্গু রুট থেকে আসা পর্বতারোহীরা কিলিমানজারো পর্বতের ৫,৬৮৫ মিটার বা ১৮,৬৪৬ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট গিলম্যান পয়েন্টে মিলিত হচ্ছেন। এখান থেকে এই ধারাটা যেন ঢলে পরিণত হয়েছে। এখান থেকেই আর্নি আমাদের দূরে পর্বতারোহীদের একটা মিলনস্থল দেখিয়ে জানালেন, সেটাই কিলিমানজারোর সর্বোচ্চ পয়েন্ট - উহুরু পিক। যদিও গিলম্যান পয়েন্টে তীক্ষ্ণ খাড়া ঢাল বাওয়া শেষ হয়ে সেখান থেকে চূড়ার পথ বেশ সাবলীল উচ্চতায় চলে গেছে, কিন্তু সময়ের হিসাবে তখনো আমাদের প্রায় সোয়া ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হবে।

ততোক্ষণে সূর্য পুরো উঠে গেছে। গিলম্যান পয়েন্ট থেকে কিলিমানজারোর কিবো আগ্নেয়গিরির মৃত জ্বালামুখটা বেশ স্পষ্ট চোখে পড়ে। লম্বায় এর আনুমানিক ব্যাস প্রায় তিন কিলোমিটার হবে। কিন্তু চওড়ায় হয়তো প্রায় এক কিলোমিটার। আর যে খাড়া ঢাল বেয়ে মাচামি রুট ধরে গিলম্যান পয়েন্ট পর্যন্ত পথ চলে গেছে, সেই রুটের নাক বরাবর একটা ঢাল খাড়া নেমে গেছে। এখান থেকে জ্বালামুখের গভীরতাটা বোঝা যায়। সেই সঙ্গে এটাও বোঝা যায় যে যৌবন থাকাকালে এই কিবো আগ্নেয়গিরি থেকে কি পরিমাণ লাভা উদগীরণ হয়েছিল।

তখনো কোনো বরফ চোখে পড়ে নি। কিন্তু শিরা ক্যাম্প থেকে তো স্পষ্টই কিলিমানজারোর বহির্গাত্রে বরফ দেখেছিলাম। সেই বরফ গেল কই? চূড়ার দিকে এগোতে এগোতে বরফের দেখা মিলল ৫,৭৫৬ মিটার বা ১৮,৮৮০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত স্টেলা পয়েন্টের কাছাকাছি যাওয়ার পর। কিলিমানজারো পর্বতের পশ্চিম দিকে অ্যারো গ্লেসিয়ার বিরাট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর ঠিক উল্টো পার্শ্বে, পূব দিকে আরেকটা গ্লেসিয়ার। এই হচ্ছে কিলিমানজারোয় বরফের উপস্থিতি।
ততোক্ষণে চূড়ার আরও কাছে চলে এসেছি। এর মধ্যে কিলিমানজারোর চূড়া উহুরু পিক জয় করে অনেকে আবার ক্যাম্পের দিকে ফিরতি পথ ধরেছেন। আর আমাদের চূড়া জয় তখন মাত্র সময়ের ব্যাপার। বহু ধরনের, নানা বয়সের পর্বতারোহীদের চোখে পড়ছে। যারা চূড়া জয় করে ফিরছেন, তাদের চেহারায় যেন এক ধরনের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছে। আর যারা বয়স বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা নিয়ে কিলিমানজারো জয় করছেন, তাদের উচ্ছ্বাস যেন আরেকটু বেশি।

আমরাও ক্রমেই চূড়ার নিকটতর হলাম। আর মাত্র পাঁচ মিনিট! চার মিনিট, তিন, দুই, এক মিনিট!
হুররে! পৌঁছে গেছি কিলিমানজারো পর্বতের চূড়া? উহুরু পিকে। বাংলাদেশ থেকে সেভেন সামিট অভিযান শুরুর পর এই প্রথম কোনো মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়ায় প্রথম সফল অভিযান। কিলিমানজারো পর্বত তখন আমাদের পায়ের নিচে। এভাবেই নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশ - এনএসিবি?র মাধ্যমে ২৩ মে ২০১০ তারিখে বাংলাদেশ থেকে প্রথম এভারেস্ট জয়ের পর সেভেন সামিট অভিযানের দ্বিতীয় ধাপ কিলিমানজারো পর্বত ১২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় ৭টা ৪৮ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১০টা ৪৮ মিনিট) জয় করেছি। অর্থাৎ মধ্যরাত সোয়া ১টায় সামিট পুশ শুরু করে ৬ ঘণ্টা ৩৩ মিনিট আরোহণ শেষে কিলিমানজারোর সর্বোচ্চ পয়েন্ট ১৯,৩৪০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট উহুরু পিক-এ পৌঁছে এনএসিবি?র সদস্য নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী ও আমি সেখানে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালাম। মাচামি গেট থেকে ট্রেক শুরু করে পঞ্চম দিনে এ জয় অর্জন হলো। আনন্দে আমরা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত - ?আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি?র প্রথম স্তবকটা গেয়ে ফেললাম। আমাদের আরেকটি স্বপ্ন পূরণ হলো।

এ সময় একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলাম। আনন্দে জড়িয়ে ধরছিলাম সবাইকে। আর্নি আর অ্যান্টিপাসকে ধন্যবাদ জানালাম। নিয়াজ আমাকে ধন্যবাদ জানালে জিজ্ঞেস করলাম, কি উদ্দেশ্যে? তিনি বললেন, আপনার জন্য এই পর্বতাভিযানে আসা সম্ভব হয়েছে। আপনি সুযোগ না করে দিলে হয়তো জীবনে কিলিমানজারো আসা হতো না। এবার তাকে বললাম, আমার কি সাধ্য আপনার জন্য কিছু করি। সবই হয়েছে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায়। সবই আপনার ভাগ্য।
এ সময় এমএ সাত্তারের জন্য আফসোস হচ্ছিল। কারণ তার চেয়েও বেশি বয়সী বহু পর্বতারোহী কিলিমানজারো পর্বত জয় করে ফিরছেন। তিনি সুস্থ থাকলে পুরো দলই আজ সফল হওয়ার সুযোগ ছিল।
« Day 12 
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact