Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 7
স্বপ্নের এভারেস্ট বেস ক্যাম্প
এপ্রিল ১৪, ২০১০
৭ম দিন

ভোর ৬টা:
আজ ভোরে নাশতা সেরেই জিপে উঠে বসলাম ব্যাগসহ। অবশ্য হোটেলের রুম থেকে বের হয়ে রেস্টুরেন্টে ঢোকার আগেই ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে বের হয়েছি। এরপর ব্যাগ রেস্টুরেন্টের সামনে রেখে নাশতা সারতে ঢুকেছি সবাই। জিপ নিয়ে যাবে এদিন তিংরি থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরের বেস ক্যাম্পে। কিন্তু জিপ তো যাবে প্রায় ১৭ হাজার ফুট পর্যন্ত? কোনো পর্বতের রিজ তো পার হতে হবে না? ঠিকঠাক মতো পারবে তো নিয়ে যেতে? এমন বহু প্রশ্ন এসে ভর করে মনে। করলেও মনের কোণে এক ধরনের উচ্ছ্বাস। সেই এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছাবো। স্বপ্নের শুরু হবে এখানটাতেই।

জিপ ছুটল বেস ক্যাম্পের পানে। মূল সড়ক ছেড়ে মিনিটখানেকের মধ্যেই জিপ নেমে পড়ল পার্বত্য পথে, তিংরির বিস্তীর্ণভূমিতে। এই বিস্তীর্ণভূমি ধরে ছুলান মন্দির, লাংথ্যাং পার হয়ে নাংপা লা পাসের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছি সোম বাহাদুর, লাল বাহাদুর জিরেল, জিপ চালক আর আমি। এই জীপটাই আমাদের সেই তিব্বত সীমান্ত থেকে এতোদূর পর্যন্ত নিয়ে চলেছে। ড্রাইভার বেশ চৌকষ। সব বাঁক যেন তার মুখস্ত। তাই মাঝে মধ্যেই হঠাত কোনো নদীর ওপর খাড়া পথ হাজির হলে বেশ সামলে চালাচ্ছেন জীপ। একবার তো বুক ধড়াস করে উঠল। পর্বতের গা খোদাই করে জীপ বা ট্রাক যেতে পারে- এমনভাবে রাস্তা তৈরি করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেই পথের নিচের অংশে নদী এবং পুরোটাই এতো খাড়া যে মনে হচ্ছে কোনোক্রমে একটা চাকা ফেসে গেলেই হলো, সবার ঠিকানা হবে সমুদ্রে।

সোম বাহাদুর জানালেন নাংপা লা পাস দিয়েই শুরুর দিককার এভারেস্ট অভিযাত্রীরা দার্জিলিং থেকে তিব্বতের রংবুক গ্লেসিয়ারে অবস্থিত বেস ক্যাম্পে পৌঁছতেন। তার মতে এই পাস পার হওয়ার অর্থ হলো সহজেই উচ্চতার সঙ্গে খাপ খেয়ে যাওয়া। সোম বাহাদুর একবার এ পাস পার হয়ে রংবুক গ্লেসিয়ারে এসেছিলেন, জানালেন তিনি।

সকাল ৯টা:
এই পাসের কাছাকাছি পথ ভাগ হয়ে গেছে। একটা রাস্তা গেছে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প আরেকটা চো য়ু বেস ক্যাম্প। এরপর জিপ জোমাগ পার হয়ে বুদ্ধদের বহু প্রাচীন জা রংবুক তীর্থালয় গিয়ে থামল। এসব জায়গায় ইয়াক, ছাগল আর ভেড়াপালক ছাড়া লোকজনের দেখা পাওয়া ভার।

অভিজ্ঞ জিপ চালক এর আগেও বহু বহুবার গিয়েছেন বেস ক্যাম্পে। তিনি জানেন যে রংবুক মনাস্ট্রিতে সব পর্বতারোহী একবার হলেও থামেন রংবুক মনাস্ট্রি?র অবাক করা শতাব্দী প্রাচীন মন্দির ঘুরে দেখতে। আমিও হয়তো অন্য সময় হলে সেই রংবুক মনাস্ট্রি ঘুরে দেখতাম। কিন্তু তখন মাথায় বেস ক্যাম্পে পোঁছার চিন্তা। তাই জিপ থেকে না নেমে বললাম বেস ক্যাম্প চলে যেতে। আর এসব দেখে জিপ চালক অবাক। এরপর সামনে থাকলো শুধু সাকাং বাজার। চীনা সেনাবাহিনীর তৈরি পথ ধরে মিনিট পনের?র মধ্যেই পৌঁছলাম বেস ক্যাম্পের আগে অবস্থিত চেকিং ক্যাম্পে।

এখানে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হাজির হলাম বেস ক্যাম্পে। ঘড়িতে সময় তখন সকাল এগারটা। অর্থাত তিন ঘণ্টায় পৌঁছেছি গন্তব্যে।

চোখের সামনে তখন জ্বলজ্বলে এভারেস্ট। কিছুক্ষণ বিশ্বের সেই সর্বোচ্চ পর্বতের দিকে স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এই তো সেই এভারেস্ট। যেখানে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়াবো বলে এতো কষ্ট করে এসেছি। এই তো সেই জায়গা, যার জন্য এতোদিনের প্রস্তুতি, এতো বাধা পার হওয়া, সংসারের সম্পর্ক অনেকটা উপেক্ষা করে এসেছি। সেই এভারেস্ট কি ধরা দেবে সাফল্যের মুঠোয়? কবে আলিঙ্গন করবো সেই স্বপ্নগাঁথা?

মনে পড়ছে ২০০৪ সালে নেপাল দিয়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকিংয়ের কথা। সেবার যেদিন বেস ক্যাম্পে গিয়েছিলাম, সেদিন দেখি দলে দলে অভিযাত্রীরা এভারেস্ট জয় করে নেমে আসছেন। তখন এভারেস্টের আকর্ষণটা এমন ছিল যে মনে হয়েছিল এখনই দৌড় দেই। এভারেস্টের দিকে চলে যাই। কিন্তু বেস ক্যাম্প পার হতে গেলেই তো বাকি পথে অভিযানের অনুমতি দরকার, অভিযানের পোশাক-সরঞ্জাম-আয়োজন দরকার। এর তো কিছুই নেই। কাজেই সেই ইচ্ছার সমাপ্তি হয়েছিল সেখানেই।

সেই এভারেস্ট অভিযানে এসেছি ২০১০ সালে। তখন যা ছিল ফ্যান্টাসি, এখন সেটা বাস্তবতা। এসব হঠাত মনে পড়ছে। আর ভাবছি অন্তত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছি এ পর্যন্ত। কারণ অন্য কেউই বেস ক্যাম্প থেকে এখনও অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্পের (এবিসি) দিকে রওয়ানা দেয় নি। পরে জেনেছি দু?দিন পরে শুরু হবে সেই মহারণ। হলেও কাঠমান্ডুতে থাকতে যে একটা আশংকায় বুকটা দুরু দুরু করে করছিল যে আমি হয়তো পিছিয়ে পড়েছি আর সবার চেয়ে, কিন্তু এ মুহূর্তে নিজেকে নির্ভার লাগছে। কারণ যারা আগেই বেস ক্যাম্পে এসেছে, তারা হয়তো এ উচ্চতার সঙ্গে খাপ খেয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়েছে বেশি। কিন্তু এখন যেহেতু এসেই পড়েছি বেস ক্যাম্পে, কাজেই এভারেস্ট জয়ের এখন প্রতিযোগিতাটা সমান-সমান।

এসব ভাবছি আর সোম বাহাদুর গাড়ি থেকে ব্যাগ নামাচ্ছেন। এ সময় ঈশ্বরী?র ছোট ভাই বেস ক্যাম্প ম্যানেজার ভোলা পাড়ওয়াল এগিয়ে এসে পরিচয় দিয়ে বেস ক্যাম্পের সব স্থাপনা বুঝিয়ে দিলেন। ডাইনিং টেন্ট, কিচেন টেন্ট, টয়লেট টেন্ট ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি নিজের তাঁবুও চিনে নিলাম। তাঁবুতে মোটা ফোমের ম্যাট্রেস বিছিয়ে সেখানে ব্যাগ ঢুকিয়ে রাখা হলো।

বেলা ১২টা:
ভোলা পাড়ওয়ালের সঙ্গে পরিচয়ের পর আমার এভারেস্ট অভিযানে আসার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করলাম। তাকে বললাম, এখান পর্যন্ত পৌঁছতে যে পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে শেরপা এবং আমাকে, কাজেই এর যোগ্য প্রতিফল হতে পারে যে কাজে এসেছি, সে কাজে সাফল্য করায়ত্ত করা। এজন্য তার দলের সহায়তা খুব বেশি প্রয়োজন। ভোলা পাড়ওয়াল অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। এ সময় সোম বাহাদুরও দু?চারটা ঘটনার কথা ভোলাকে জানালেন। শুনে ভোলা বললেন- ?এখানে যতোজন মানুষ আছে, সবাই পর্বতারোহীদের সহায়তা করার জন্যই। সবাই নিঃস্বার্থভাবে পর্বতারোহীদের প্রতিটি কাজ করছে। সুতরাং তুমি কিছু ভেব না। সবকিছু ঠিক থাকলে তুমি সফল হবেই।? তার আশ্বাসে বুক বাধলাম। আর দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিজ্ঞা করলাম যে সব কষ্টের যোগ্য প্রতিফল হলো প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া।

গনগনে সূর্যের আলো তখন বেস ক্যাম্পে। ফলে বেশ জোরে বয়ে চলা বাতাস তেমন ঠান্ডা মনে হচ্ছে না। রোদের ওম পেতে তাঁবুর বাইরে ম্যাট্রেসের ওপর কেউ কেউ শুয়ে থাকলো। আন্তর্জাতিক দলে তাইওয়ানের দু?জন পর্বতারোহী (ভাষাগত ব্যবধানের কারণে তাদের সঙ্গে আলাপ হতো কম। তাই তাদের নামও জানা হয় নি), মন্টেনেগ্রো?র তিন পর্বতারোহী জোকো, ব্লেকা ও স্ল্যাগি, সার্বিয়ার ডাক্তার ড্রাগুটিন, নেপালের লাল বাহাদুর ও বাংলাদেশ থেকে আমি- এই মোট আটজন পর্বতারোহী রয়েছি।

আরও রয়েছে প্রায় পনেরজন শেরপা গাইড, কিচেন কুক ও সাপোর্ট টিমের সদস্যরা। সব মিলিয়ে বেস ক্যাম্প বেশ সরগরম। সবাই কর্মব্যস্ত। মূলত এ উচ্চতার ঠাণ্ডায় শরীরকে উষ্ণ রাখতেই সবার ব্যস্ততা। এ সময় জানা গেল বৃটিশ পর্বতারোহীদের বিশাল এক দল রয়েছে একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায়। সেই দলের সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৩ জন। ফলে তাঁবু স্থাপন করতে হয়েছে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক। এ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরও অনেক প্রতিষ্ঠানই আরও অনেক দেশের অভিযাত্রীদের এভারেস্ট অভিযানে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে বেস ক্যাম্প যেন তাঁবুরণ্য হয়ে গেছে।

এ পর্যায়ে হঠাত পেট মুচড়ে উঠল। সকালে প্রচন্ড ঝাল দিয়ে নুডলস স্যুপ দিয়েছিল খেতে। এখন সেটার মজা বুঝতে পারছি।

দুপুরে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিতেই মাথা ব্যথার ভুত যেন আবার চেপে বসল। এ সময় পাশের একটা পর্বত খাঁজে একাই চলে গেলাম ?গো হাই, স্লিপ লো? নিয়ম মেনে হাইকিং করতে। সেখান থেকে বেস ক্যাম্প এলাকার বিশালত্ব চোখে পড়ল। মূলত রংবুক গ্লেসিয়ারের ওপর ডায়নামিক মোরেইন যে জায়গাটিতে এসে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই পানির উতসের আশপাশে গড়ে তোলা হয়েছে বেস ক্যাম্প। চীনা সেনাবাহিনীর একটা ক্যাম্পও রয়েছে এখানে।

পূব থেকে পশ্চিমে বয়ে যাওয়া একটা বরফময় নদী গিয়ে মিশেছে উত্তরে বয়ে চলা আরেকটা বরফময় নদীর সঙ্গে। সকাল-সন্ধ্যা এখানে জোর বাতাস বয়ে চলে। বাতাসের ঝাপটা থেকে মুখকে বাঁচাতে এ সময়ে কাপড় পেঁচিয়ে রাখলাম। এই হাইকিংয়ের পরও যখন মাথা ব্যথা পুরো সারল না, এ সময়ে যতো উচ্চতায় রয়েছি- ঠিক সে পরিমাণ (পাঁচ হাজার মিটার উচ্চতায় পাঁচ লিটার, ছয় হাজার মিটারে ছয় লিটার) তরল পানের তত্ত্ব অনুসরণ করা শুরু হলো। ফলে বাকি সময়টা ডায়নিং টেন্টের ভেতরেই কেটে গেল। তাঁবুর মধ্যে ঢুকলে অবশ্য একটা সুবিধা রয়েছে, বাতাসের সঙ্গে হুল ফুটিয়ে চলা ঠান্ডা থেকে বাঁচা যায়। আর বাতাস যাতে ডায়নিং টেন্টের ভেতর ঢুকতে না পারে, সেজন্য তাঁবুর কাপড় দু?স্তরবিশিষ্ট করে তাঁবু টানানো হয়েছে।

বেলা ৩টা:
এ সময়ে অন্যান্য পর্বতারোহীদের সঙ্গে আলাপ হলো। সার্বিয়ার ডাক্তার ড্রাগুটিন এবং মন্টেনেগ্রো?র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ব্লেকা ইংরেজিতে বেশ পারদর্শী। তবে মন্টেনেগ্রো?র অন্য দুই পর্বতারোহী এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের কর্মকর্তা জোকো এবং স্ল্যাগি ইংরেজি সামান্য বুঝলেও ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন না। তাদের জন্য ড্রাগুটিন ও ব্লেকা দোভাষীর কাজ করছেন। আর তাইওয়ানের দুই পর্বতারোহী ইংরেজি বোঝেনও না, কথাও বলেন তাইওয়ানিজ ভাষায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল যে তাদের হয়ে কেউ দোভাষীর কাজ না করায় তাদের সঙ্গে কথোপকথনও ছিল একেবারে সীমিত। ইশারা-ভাষায় টুকটাক কাজ চালানো গেলেও সেটা তো সাবলীল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। কাজেই তাইওয়ানের দু?পর্বতারোহী নিজেদের মধ্যেই মশগুল থাকতো সবসময়।

সন্ধ্যা ৬টা:
এ রাতে স্ল্যাগি?র ইংরেজি শুনে হাসি ধরে রাখতে পারলাম না। ঘটনাটা হলো- ডায়নিং টেন্টের ভেতর একটা টেবিল পেতে তার চারদিকে চেয়ার রাখা হয়েছে পর্বতারোহীদের বসার সুবিধার জন্য। তবে সেই চেয়ার জায়গা স্বল্পতার কারণে তাঁবুর গায়ে লেগে যাওয়ায় যদি কেউ খাবার টেবিলের একেবারে শুরুর দিকে বসে, তাহলে তাকে ভেতরের দিকে অন্য পর্বতারোহীদের যাওয়ার সুযোগ করে দিতে বারবারই উঠতে হয়। আর টেবিলে বাদাম, কিসমিস, বিস্কুট, চকলেট, দুধ, চকলেট পাউডার, গরম পানি-চা-দুধের আলাদা ফাস্ক ইত্যাদি জিনিসপত্র রাখায় টেবিল ভরে থাকে। এর ফলে টেবিলের শুরুর দিকে যারা বসেন, তাদেরকে বাধ্য হয়েই থালায় সাজানো খাবার-দাবার এগিয়ে দিতে হয় টেবিলের শেষ দিকে বসা পর্বতারোহীদের কাছে। এটা এক ধরনের ভদ্রতাও।

এ সময়ে আমি যখন এ কাজটি করছিলাম, সে সময়ে স্ল্যাগি বলে উঠল ?মুসা কুকের?, ?গুড, মুসা কুকের?। স্ল্যাগি কি বোঝাতে চাইছে, তা আত্মস্থ করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগে গেল। পরে বুঝলাম- পাচককে আমরা ইংরেজিতে বলি কুক। স্ল্যাগি তার মতো করে ক্রিয়াপদ ?কুক? থেকে বিশেষ্য করেছেন ?কুকার?। আর তিনি যেহেতু কথা বলেন মন্টেনেগ্রিন ভাষায় এবং এর ফলে যেহেতু ইংরেজিতে তার দখল সামান্য কম, তাই কুকার?কে তিনি বলছেন বর্ণমালার উচ্চারণ অনুসারে ?কুকের?। শুনে শেরপাদের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতেই তারাও মজা পেল। এই সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো?র পর্বতারোহীদের সঙ্গে পরে বেশ ভালো সম্পর্ক হয়েছিল।

রাত ৯টা:
রাতের খাবার ছিল বেশ ঝকমারি। ইউরোপীয় ধাঁচের খাবারে এদিন ছিল বাটার দিয়ে সবজি, নুডলস, স্যুপ, বিফস্টেক ইত্যাদি। যদিও আমার ?টেস্ট? অনুসারে কোনোটাই ছিল না, কাজেই কোনোমতে সেইসব খাবার গিললাম। সব শেষে এই রাতে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ?কুক? বানিয়ে আনল নতুন বছরের কেক। নতুন বছর- ভুলেই গেছিলাম যে আজ ১৪ এপ্রিল এবং এদিনটি বাংলা নববর্ষের মতো নেপালেরও নতুন বছরের প্রথম দিন। আমাদের বাংলা নতুন বছর ১৪১৭ হলেও নেপালিদের ২০৬৭। নতুন বর্ষকে বরণ করে নিতেই এই ?আপেল কেক? বানানো হয়েছে। শেরপা, সাপোর্ট টিম, পর্বতারোহীসহ আরও অনেকেই এই ক্ষণটুকু উদযাপন করলাম কেক কেটে।

এরপর প্রচুর পানি খেয়ে রাত ন?টার দিকে তাঁবুতে চলে গেলাম ঘুমাতে। এদিন থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত সোম বাহাদুর ছিলেন আমার ?টেন্ট মেট?। তাকে সঙ্গী হিসাবে পেয়ে একটা সুবিধাও হলো। বহু বিষয় তার সঙ্গে আলাপ করেছি। কিভাবে তিনি এ পেশায় এলেন, পর্বতারোহণে কোন বিষয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি টানে, বাংলাদেশের পর্বতারোহীদের সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গী কেমন, এভারেস্ট অভিযানে কিভাবে মনকে চাঙ্গা রাখা যায়, প্রতিটা ক্যাম্প সাইট-এ কাজকর্ম কেমন হবে, এভারেস্ট অভিযানে তাঁবুতে রাত কাটানোর কায়দাকানুন ইত্যাদি জেনে নিতে পেরেছিলাম।

এই প্রথম কাঠমান্ডুতে স্থানীয়ভাবে তৈরি স্লিপিং ব্যাগ ব্যবহার করছি প্রায় সতের হাজার ফুট উচ্চতায় এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে। ডায়নিং টেন্ট থেকে রাত কাটানোর তাঁবুতে পৌঁছতে যে সেকেন্ড বিশেক সময় লাগে, তাতেই এভারেস্ট থেকে উত্তর দিকে বয়ে চলা হিমঠান্ডা বাতাসে যে হাত-পা-চোখ-মুখ কাহিল হয়ে যায়, এই স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢুকতেই সেই ঠান্ডা থেকে বাঁচা গেল- এতই উষ্ণ। সোম বাহাদুর ঘুমানোর আগে তাঁবুর দু?দিকের চেইন সামান্য খুলে রাখলেন ?ভেন্টিলেশন?-এর সুবিধার জন্য। তার মতে এভাবে তাঁবুর মধ্যে বাতাস চলাচল করলে রাতের বেলা অক্সিজেন স্বল্পতায় ভুগতে হবে না। নয়তো অক্সিজেন স্বল্পতায় মাথা ব্যথা শুরু হবে।

সুবিধাই বটে। এ সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে ঠান্ডা বাতাস তো সরাসরি মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে। এ সমস্যা সোম বাহাদুরকে বলতেই তিনি একটু সরে অন্যদিকে পাশ ফিরে ঘুমাতে বললেন। কিন্তু প্রথম দিন আটসাট স্লিপিং ব্যাগে ঘুমানোর অস্বস্তি থেকে রেহাই পেতে যেই না স্বাভাবিক হয়ে ঘুমাতে যাই, সেই ঠান্ডা বাতাস এসে মুখের ওপর পড়ছে। এ থেকে বাঁচতে এবার গামছা পেঁচিয়ে নিলাম সারা মুখে। আর ঘুমানোর আগে ক্যামেরা ঢুকিয়ে নিলাম শরীরের ভেতর যাতে ঠান্ডায় ক্যামেরার ব্যাটারি জমে না যায়।

এভাবেই আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্য দিয়ে মাঝরাত পার হলো। এরপর ঘুম ভাঙল তীব্র মাথা ব্যথায়। এর আগের পর্বতাভিযানগুলোতে মাথা ব্যথা করেছে পুরো মাথা জুড়েই। কিন্তু এবার এক অদ্ভুত ধরনের মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে অনুভব করলাম। তিংরির মতোই মাথার ঠিক মাঝ থেকে নাক বরাবর একটা সরলরেখায় তীব্র ব্যথা করছিল। এই ব্যথা থেকে বাঁচতে প্রথমে ফ্যাস্কে রাখা পানি খেলাম। এ সময় দেখলাম সোম বাহাদুর ঘুমাচ্ছেন বেশ নাসিকগর্জন সহকারে। পানি খেয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। এক সময় যখন মনে হলো যে এখন মাথা ব্যথা বেশ কমে গেছে, সে সময়ে ফের ঘুমানোর চেষ্টা করলাম সেই ঠান্ডা বাতাস থেকে মুখ বাঁচিয়ে। এক সময় স্বস্তির ঘুম।
« Day 6  Day 8 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact