Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 54
বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট জয়: আয়োজন সহযোগী ও শেরপাদের চোখে

প্রশ্ন: মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট আয়োজন করে আপনার অনুভূতি কী? আপনি নিজেকে এ অভিযানে কীভাবে জড়ালেন?
কোমল অরিয়াল: মুসার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ২০০৭ সালে আমার ব্যবসায়িক অংশীদার সারিন প্রকাশ প্রধানের মাধ্যমে। সারিন আর মুসা একই সঙ্গে তাদের পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ কোর্স করেছিল দার্জিলিং থেকে। তার (মুসা) সঙ্গে যখন দেখা হলো, দেখে মনে হয়েছিল একজন নিবেদিত ব্যক্তি, যে কিনা এভারেস্টে যেতে চায় ২০১০ সালের মধ্যেই। আমরা (আমি আর সারিন) সিদ্ধান্ত নিলাম, তাকে আমাদের সহায়তা করতে হবে তার স্বপ্ন পূরণ করতে এবং পরে এটা আমাদেরও স্বপ্ন ছিল।
তার (মুসা) সঙ্গে এ অভিযান নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ হয়েছে। সে স্পন্সর পাওয়ার ক্ষেত্রে তার বন্ধুদের সহযোগিতা ও সমস্যার কথা সব সময়ই আমাদের কাছে বলত। আমি ভাবতাম, এর মধ্য দিয়েই আমাদের সফল হতে হবে। তাই আমি কাঠমান্ডুতে সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানের খোঁজ করা শুরু করলাম। একসময় আমার চাচাতো ভাই কৃষ্ণ অরিয়ালের মাধ্যমে তার বন্ধু হিমালয়ান গাইডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঈশ্বরী পাড়ওয়ালের সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কথাও বললাম। তার প্রতিষ্ঠান আমার প্রতিষ্ঠানের (মুক্তিনাথ হলিডেজ প্রাইভেট লিমিটেড) কাছেই। সুতরাং তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম এবং তার প্রতিষ্ঠানের সাফল্য সম্পর্কেও আমার জানাশোনা ছিল। এভাবেই একটা আত্মবিশ্বাস আমার ছিল যে মুসার জন্য আমি সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই তার (মুসা) এভারেস্ট অভিযান আয়োজন করছি।
আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম, মুসা কাঠমান্ডুতে এভারেস্ট অভিযানের তিন সপ্তাহ আগে এসে পৌঁছাবে এবং তাকে লাংটাং হিমালয়ে পাঠিয়ে তার অ্যাক্লেম্যাটাইজেশনে সহায়তা করা হবে। এ সময় তার একটা টেকনিক্যাল ট্রেনিংও হয়ে যাবে। কিন্তু তার আর্থিক সমস্যার কারণে সময়মতো এটা আমরা করতে পারিনি।
সময় পার হয়ে যাচ্ছিল এবং মুসা তার পুরো আর্থিক সহযোগিতা জোগাড় করতে পারেনি। আমি তার সমস্যা বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু হিমালয়ান গাইডস থেকেও এ সময় আমাকে অভিযান আয়োজনের জন্য অর্থ জমা দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত তার শ্রদ্ধেয় বোন ও তার পরিবার তাকে এ ব্যাপারে সহায়তা করে। তাই একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে মুসার অভিযান সম্পর্কে হিমালয়ান গাইডসকে নিশ্চিত করেছি এবং একেবারে শেষ দিনে গিয়ে মুসার প্রতিটি অফিশিয়াল কাগজপত্র এবং ভিসা ঠিকঠাক করতে হয়েছে। আমার এখনো ভয় হয় যে, মুসার বোন তাকে সহায়তা না করলে আমাদের স্বপ্ন আমরা পূরণ করতে পারতাম না।
তো মুসার সঙ্গে ২০০৭ সালে যখন দেখা হয়েছিল, সে সময়েই একটা স্বপ্ন মনে এঁকে নিয়েছিলাম যে তাকে এভারেস্ট পর্বত জয়ে সহায়তা করতে হবে। সারিন, সোম বাহাদুর ও আমি একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে তাকে সফল করেই ছাড়ব। পরে কৈলাস তামাংও এ দলে যোগ দেয়। মুসা আর আমার মধ্যে সম্পর্কটা শুধু পেশাদারি ছিল না, বরং আমরা ছিলাম পারিবারিক সদস্যের মতো। যখন আমি আর সারিন বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, তখন আমরা তার বাসায় থেকেছি। আর প্রতিবারই মুসা যখন নেপালে আসে, সে ন্যূনতম একবার হলেও আমার বাসায় একবার ডিনার করে। আমার পরিবারের প্রত্যেক সদস্য তাকে চেনে এবং তাকে আরেকটা ছেলের বা ভাইয়ের মতোই ভালোবাসে।

প্রশ্ন: এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছে আপনার অনুভূতি কী ছিল? মুসাকে এ সময় সহায়তা করে আপনি কি খুশি ছিলেন?
সোম বাহাদুর: আমি খুবই খুশি ছিলাম। আমি মুসার সঙ্গে ২০০৭ সালের চুলু ওয়েস্ট অভিযান থেকে কাজ করছি। সে তার ২০১০-এর এভারেস্ট অভিযানের যে লক্ষ্য, সেটাকে অর্জন করার জন্য আমার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছিল। আর আমি আমার দিক থেকে তার স্বপ্নকে অর্জন করার জন্য যাবতীয় চেষ্টা করেছি। আমাদের (কোমল, সারিন আর আমি) একটা স্বপ্ন ছিল যে তাকে সফল করাতেই হবে। কাজেই এটা শুধু তার একার জয় নয়, এটা আমাদেরও জয়।
আমার এখনো সেই দিনের কথা মনে হয়, যেদিন মধ্যরাত ১২টার দিকে খবর পেলাম যে তারা মাউন্ট এভারেস্টের সামিটের দিকে ৮,৩০০ মিটার থেকে ফের যাত্রা শুরু করেছে। আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। আমি এ খবর শুনে খুশি ছিলাম, আবার মনের এক কোনায় সামান্য ভয়ও কাজ করছিল। রাত প্রায় দুইটার দিকে আবার খবর পেলাম যে তারা নর্থ ফেসের সেকেন্ড স্টেপ পার হয়ে গেছে। তখন আমার খুশির পারদের মাত্রাও চড়ে গিয়েছিল। আমি রাত দুইটা ৪৫ মিনিটে মন্টেনেগ্রোর পর্বতারোহী ব্লেকার শেরপা লাকপা গেলুর কাছে আবার খবর পেলাম যে তারা বিশ্বের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গেছে এবং মুসা ও অন্যরা হয়তো আর প্রায় আধঘণ্টার মধ্যে সেখানে পৌঁছাবে। এ সময় আবার আমার ভয়ও হচ্ছিল। কারণ, মুসার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না এবং তার রেডিও কাজ করছিল না।
এ কারণে আমি অন্য গ্রুপের শেরপাদের রেডিওতে যোগাযোগ করছিলাম। এ সময় সার্বিয়ার পর্বতারোহী ডাক্তার ড্রাগুটিনের ক্লাইম্বিং শেরপা ফুতাসির রেডিওতে যোগাযোগ করলাম। এ সময় সে জানায়, এই মাত্র তারা চূড়ায় পৌঁছেছে এবং মুসা ও তার দুই শেরপা এখনো সেই চূড়ায় রয়েছে। মুসা আর তার দুই শেরপা তাদের আগেই এভারেস্ট চূড়া জয় করেছে। সে সময় ফুতাসি তার রেডিও কৈলাস আর মুসার কাছে দেয় এবং আমি তাদের সঙ্গে কথা বলি। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমার আনন্দও যেন বিশ্বের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।

কৈলাস তামাং: সত্যিকার অর্থে, এটা আমার পেশা। প্রতিটা সাফল্য আমার ক্যারিয়ারে একটা করে পয়েন্ট যোগ করতে সহায়তা করে। নেপাল থেকে ২০০৮ সালে একবারই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ১০ জন মেয়েকে নিয়ে একটা এভারেস্টগামী দল করা হয়েছিল। আমি সেই সফল দলের সঙ্গে ছিলাম। আর মুসার সঙ্গে এটা আমার তৃতীয় এভারেস্ট অভিযান। একেবারে মন থেকে বলি, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে মুসার পদচিহ্ন স্থাপন তাকে বিশ্বের সত্যিকার আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিণত করেছে এবং আমি সব সময়ই সৃষ্টিকর্তাকে এ জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই।
মুসার সঙ্গে যখন ২০০৯ সালের মে মাসে অন্নপূর্ণা ফোর পর্বতারোহণের সময় সাক্ষাৎ হয়, তখন আমি কোমল, সারিন ও আমার চাচা সোম বাহাদুরের দলে ছিলাম। এ সময় মুসাকে ২০১০ সালের মধ্যে এভারেস্টজয়ী হিসেবে পরিণত করার ইচ্ছায় আমিও তাদের মতো উজ্জীবিত হলাম। এই টিমওয়ার্ক আমাকে মুসার স্বপ্নের মধ্যে আসতে সহায়তা করেছে। সৃষ্টিকর্তাও সবকিছু অবলোকন করছিলেন, শুনছিলেন। মুসা যে সময় এভারেস্ট অভিযানে যাচ্ছে সেই মৌসুমে অন্য দলের সঙ্গে যাওয়ার প্রচুর প্রস্তাব ছিল এবং মুসা আর্থিক দুর্গতির কারণে তার এভারেস্ট অভিযান চূড়ান্ত করতে পারছিল না। কিন্তু আমি তাকে ছেড়ে যেতে পারিনি এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের স্বপ্ন সত্যিতে পরিণত হয়েছিল। এই স্বপ্নের অংশ হয়ে এবং একে পূর্ণ করতে পারায় সত্যিই ভালো লাগছে, খুবই খুশি আমি। সেই সময় মুসা শুধু পেশার কারণে নয়, সব মিলিয়ে সে আমার একজন ভালো বন্ধু হয়ে গেছে।

কোমল অরিয়াল: আমি যখন ঈশ্বরী পাড়ওয়ালের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে মুসার এভারেস্ট জয়ের খবর পেলাম সকাল সাড়ে নয়টায় (নেপাল সময়), এ সময় যখন তিনি জানালেন যে তাঁর ভাই ভোলা তিব্বত থেকে জানিয়েছে যে মুসা বিশ্বের সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্ট জয় করেছে, তখন আমি খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়ি। সেই উত্তেজনায় আমি ফেসবুকে মুসার ঘটনা জানিয়ে স্ট্যাটাস আপডেট করি। তখন থেকেই একের পর এক ফোন কল আসতে থাকে এবং মানসিক চাপও বেড়ে চলে। একটুও ভণিতা না করে বলছি যে আমি যখন মুসার সঙ্গে কথা বলি সেই ৮,৮৪৮ মিটার থেকে বেস ক্যাম্পে নেমে আসার পর, আমি তখন এর চেয়েও বেশি খুশি ছিলাম। আসলে সেটা তার একার স্বপ্ন ছিল না, আমাদেরও স্বপ্ন ছিল। আমার মনে হচ্ছিল যেন আমিই এভারেস্ট চূড়া জয় করেছি।

প্রশ্ন: মুসার অক্সিজেন টিউব ফুটো হয়ে যাওয়ার পর কেমন লাগছিল? তখনো কি ভেবেছিলেন যে সে (মুসা) এভারেস্ট জয় করতে পারবে?
কৈলাস তামাং: সেদিন আমরা প্রায় ৮,৩০০ মিটার থেকে আমাদের যাত্রা শুরু করেছি। আনুমানিক আড়াইটার দিকে ৮,৬০০ মিটার উচ্চতায় সেকেন্ড স্টেপ পার হওয়ার সময় আমি মুসার ঠিক পেছনেই ছিলাম এবং আমি এক ধরনের শব্দ শুনতে পাই, যা কিনা আসলে মুসার অক্সিজেন টিউব ফুটো হয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছিল। সে সেকেন্ড স্টেপে ঠিকমতো ?স্টেপ? দিতে না পারায় আসলে এমনটা হয়েছিল এবং সে ওভারহ্যাংয়ে আটকা পড়েছিল। ফলে একসময় পাইপটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি সঙ্গে সঙ্গে ভেবেছি, আমি আমার অক্সিজেন সরঞ্জাম তার সঙ্গে বদল করব এবং তার সরঞ্জামটা ডাক-টেপ দিয়ে মেরামত করব। সাধারণত প্রত্যেক পর্বতারোহীই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে সঙ্গে ডাক-টেপ রাখে। কিন্তু খাত্রা দর্জি আমাকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কোনো সময়ক্ষেপণ না করে সেই ফুটো মেরামত করতে বলে। আমরা দুজন সেটা মেরামত করেছিলাম এবং ফের আমাদের অগ্রযাত্রা এগিয়ে চলে। সেই ৮,০০০ মিটার উচ্চতার ওপরে, যেখানে অক্সিজেন ছাড়া টিকে থাকা খুবই কষ্টের, তার পরও আমরা দুজন শেরপা সেখানে তাকে সহায়তা করছিলাম। যদি তার অক্সিজেন সরঞ্জাম ঠিকঠাক করা না যেত, তাহলে হয়তো আমাদের কারও অক্সিজেন সরঞ্জাম তাকে দিয়ে একজন সেই পয়েন্ট থেকে ফিরে আসতাম। কারণ, এটা ছিল আমাদের স্বপ্ন, এটাই ছিল টিমওয়ার্ক এবং এটাকেই তো নিবেদিতপ্রাণ বলে, না কী?

সোম বাহাদুর: যখন আমি মুসার সেকেন্ড স্টেপে এ ঘটনা শুনেছি, তখন আমি খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কারণ, এ ধরনের সমস্যার পর আসলে সফল হওয়া খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে এবং মুসা সমুদ্র-উচ্চতার সমান জায়গা থেকে আসা মানুষ। এমনকি আমার অভিজ্ঞতা বলে যে, হাই অলটিচ্যুডের মানুষ শুধু অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট সামিট জয় করতে পারে।

প্রশ্ন: যখন সামিট করে মুসার সঙ্গে নিরাপদে ফিরে এলেন, তখন আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?
সোম বাহাদুর: যখন আমি কৈলাস আর মুসার সঙ্গে ফুতাসির রেডিওর মাধ্যমে কথা বলি, আমি তার নিরাপদে নেমে আসা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। কৈলাস বলছিল যে সে স্বাভাবিকভাবেই নেমে আসছে, কিন্তু তখনো আমি দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কারণ, আমি এ জগতে ৩৫ বছর ধরে কাজ করছি এবং আমি তার (মুসা) সামর্থ্য ও টেকনিক্যাল স্কিল সম্পর্কে জানি। তার সামর্থ্য বা স্কিল খারাপ ছিল না, কিন্তু ইউরোপীয়, আমেরিকান বা অস্ট্রেলীয় পর্বতারোহীদের মতো অবশ্যই ছিল না। আমার ধারণা সত্যি ছিল এবং সে নামার সময় ৮,৪০০ মিটারে আর উঠতে পারছিল না এবং তার পাওয়ার-জেল প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু আমি এটা বলব যে শুধুই তার মানসিক শক্তির জোরে সে সেই চূড়ায় গিয়ে পৌঁছেছিল।

কৈলাস তামাং: আমরা এভারেস্টের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছেছিলাম আনুমানিক চারটা ৫০ মিনিটে (নেপাল সময়)। আমরা সেখানে কিছু ছবি নিলাম। কিছু সময় পর সেখানে ফুতাসি শেরপা গিয়ে হাজির হয়। এ সময় সে তার রেডিও দেয় আমার চাচা সোম বাহাদুরের সঙ্গে কথা বলার জন্য। ব্যাটারির চার্জ কম থাকায় আমাদের রেডিও সেটটা সে সময় কাজ করছিল না। লাল বাহাদুর জিরেলও (নেপালে তার সম্প্রদায় থেকে প্রথম এভারেস্টজয়ী) সে সময় সেখানে ছিল। প্রায় ২৫ মিনিট সময় পর সেখান থেকে আমরা নামা শুরু করি। যখন ফিরছিলাম, মুসাকে দেখে মনে হচ্ছিল যে সে ক্লাইম্ব করার সময় যেমন কর্মঠ ছিল, তেমনটা আর নেই। হয়তো সে ভেবেছিল যে সে চূড়ায় পৌঁছে গেছে এবং সে তার স্বপ্নকে জয় করতে পেরেছে অথবা সে তার শারীরিক সামর্থ্যে কুলিয়ে উঠতে পারছিল না কিংবা সে হয়তো ভেবেছিল যে এটা তো শুধুই নেমে যাওয়া। সব পর্বতারোহীর জন্যই এটা গুরুত্বপূর্ণ যে অবরোহণটা খুব সহজ নয়, সবাইকে মনে রাখতে হবে, আমরা তখনো ৮,০০০ মিটার ওপরে।
আর মুসা ৮,৫০০ মিটার উচ্চতায় এসে ধপাস করে শুয়ে পড়ে। সে সেখানে কিছু সময় বিশ্রাম নেয়, কিন্তু সে উঠতে পারছিল না। আমি তার জন্য খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। কারণ, প্রতিটি অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রায় খালি ছিল। প্রত্যেক মানুষেরই শারীরিক শক্তি কমে গিয়েছিল এবং আবহাওয়াও খুব বেশি সুবিধার ছিল না। লাকপা আর আমি সেখানে ছিলাম, কিন্তু সেখানে কিছুই করার ছিল না, মুসাকেই উঠতে হবে, যেতে হবে। মুসা সবকিছু শুনছিল এবং তার উত্তরও দিচ্ছিল, কিন্তু উঠে বসার শারীরিক সামর্থ্য তার ছিল না। আমরা জানতাম যে আমরা তাকে ছেড়ে যেতে পারব না, তাই তাকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য উজ্জীবিত করতে হবে। তাই বিভিন্ন কথা বলে তাকে আমরা উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছিলাম এবং এ সময় চাচা অন্য একজনের রেডিও সেটের মাধ্যমে সোম বাহাদুরের কাছ থেকেও সহায়তা নিয়েছিলাম। চাচার কথা শুনে সে উঠে বসে এবং হাঁটতে শুরু করে।
কিছু দূর নেমে যাওয়ার পর মুসাকে বললাম, আমি একটু দ্রুত নেমে যাচ্ছি। নেমে গিয়ে তার জন্য চা-কফি বানাব। মুসার সঙ্গে লাকপা ছিল এবং আমি আবারও দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম, যখন তারা ৮,৩০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প থ্রিতে সময়মতো আসছিল না। মুসা যখন ফিরে এল, তখন জানতে পারলাম যে সে অচেতন হয়ে পড়েছিল এবং আরেকজন এভারেস্টজয়ীর কাছ থেকে পাওয়ার-জেল খেয়েছিল। মুসা ভাগ্যবান যে একজন কোমল হ?দয়ের মানুষ তার পাশেই ছিল।
এরপর সবাই যখন বেস ক্যাম্পে পৌঁছালাম এবং কোমলের সঙ্গে কথা বলে জানালাম যে আমরা সবাই মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছি এবং আমাদের স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেছি, তখন আমি সৃষ্টিকর্তাকে তাঁর আশীর্বাদের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছি। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, যেন আমার চেয়ে সুখী ব্যক্তি সেই মুহূর্তে বিশ্বের আর কেউ নেই।

প্রশ্ন: মুসার এভারেস্ট অভিযান কি আপনাকে কোনো অনুভূতি জুগিয়েছিল? যেমন - বাংলাদেশ কখনো এভারেস্টজয়ী দেশ ছিল না এবং আপনি সে দেশের একজনকে সহায়তা করছেন? এ বিষয়টি ভেবে আপনার কেমন লেগেছিল?
কোমল অরিয়াল: যখন ২০০৭ সালে মুসার সঙ্গে পরিচয় হলো, সে সময় আমি বিষয়টি জেনেছি। হয়তো বা এই রেকর্ডের কোনো গুরুত্ব ছিল, তাই আমরা তাকে সব ধরনের সহায়তা করেছি সফল হওয়ার জন্য। এখন যখন আমি ভাবি যে মুসা প্রথম বাংলাদেশি এভারেস্টজয়ী, আমার উত্তেজনা এখনো একই পর্যায়ে পৌঁছায়, যেমনটা নাকি হয়েছিল মুসা এভারেস্ট জয়ের পর বেস ক্যাম্পে নেমে এলে যখন তার সঙ্গে প্রথম কথা বলেছি। তার এই জয়কে বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। কিন্তু আমি বলতে পারি যে এই ঐতিহাসিক রেকর্ডের অংশ হয়ে এবং সেই জয়ের কথা মনে হলে, যে রেকর্ড কিনা মুসার মুখে হাসি এনে দিল, সেটা অবশ্যই আমাকে একই অনুভূতি এনে দেয়।
সোম বাহাদুর: আমার পেশাগত জীবনে আমি বহু মানুষকে তাদের স্বপ্নপূরণে সহায়তা করেছি এবং প্রতিটা সাফল্যই আমাকে প্রতিটা দিন পার করার সময় ?একটা আনন্দপূর্ণ জীবন? এনে দেয়।
কৈলাস তামাং: আমি তো সেই ২০০৯ সাল থেকেই এ দলে এসেছি। এটা আমাদের স্বপ্ন ছিল। যখন সেটা পূরণ হলো, তখন এমন মনে হয়েছিল যে আমারও একটা স্বপ্ন পূরণ হলো। আমি এর মধ্যেই বলেছি যে শুধু পেশার কারণে আমি মুসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, সে আমার বন্ধু এবং আমি তার স্বপ্নপূরণে বহুদিন থেকেই জড়িত ছিলাম। যদি না থাকতাম এবং অন্য কেউ হলে আমরা শেরপারা এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তাম না। কাজেই মুসার এভারেস্ট অভিযান অন্যদের মতো এখনো আমাকে গর্বিত করে।

প্রশ্ন: এভারেস্ট অভিযানে মুসার দক্ষতাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? যদি অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে বলা হয়, তাহলে?
সোমা বাহাদুর: একেবারে সৎমনে বলছি, মুসা একেবারে যা-তা গোছের খারাপ পর্বতারোহী নয়। আবার যদি ইউরোপীয়, আমেরিকান ও অস্ট্রেলীয় পর্বতারোহীদের সঙ্গে তুলনা করতে বলেন, তাহলে বলব যে সে খুব ভালো পর্বতারোহীও নয়। আর মুসা যে এশিয়া মহাদেশের, সে কথা কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না। আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তার কিছুটা অ্যাক্লেম্যাটাইজেশন এবং কিছু টেকনিক্যাল ট্রেনিং দরকার। এ জন্যই কোমল অরিয়ালকে আমি এই প্রস্তুতি পর্ব আয়োজন করার জন্য বলেছিলাম এবং কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে তা করা সম্ভব হয়নি। এভারেস্ট অভিযান আয়োজনের আগ দিয়ে বিষয়টি একেবারে স্পষ্টত সামনে চলে এসেছিল।
আর এভারেস্ট অভিযানে এই অ্যাক্লেম্যাটাইজেশনের জন্য কিছুটা সময় পেয়েছি। কারণ তখনো রোপ ফিক্স করা হয়নি। তাই কৈলাস, লাকপা ও আমি আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো তার সঙ্গে এ সময় ভাগ করে নিয়েছি এবং তার দুর্বলতাগুলোর সঙ্গে আমরা যুদ্ধ করেছি। সে ধীরে ধীরে উন্নতি করছিল এবং একই টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিং করতে আগে যখন তার চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল, কিন্তু পরে সে সেটা মাত্র দেড় ঘণ্টায় ক্লাইম্ব করেছে। এটা অন্য পর্বতারোহীদের জন্যও আমার মনে হয় একটা শিক্ষা।
আরেকটা বিষয়। যে কিনা সাফল্য চায়, তার উচিত যে প্রশিক্ষক তাকে প্রশিক্ষণের সময় কী বলছে তা শোনা, চিন্তা করা এবং প্রশিক্ষকের সঙ্গে ও ক্লাইম্বিং শেরপাদের সঙ্গে বেশি বেশি আলোচনা করা। এখন সবাইকে অনুরোধ করছি যে দয়া করে এটা অন্যভাবে নেবেন না, আমি কাউকে দোষও দিচ্ছি না?হয়তো মুসা প্রশিক্ষণের সময় ভালো শিক্ষার্থী ছিল না, যদি তা না হয়, তাহলে আমার কাছে মনে হয়েছে যে দার্জিলিংয়ের প্রশিক্ষণটা যথেষ্ট নয়। মুসার ?নট? বাঁধার সময়, ৫,০০০ মিটার হাই অলটিচ্যুডে তার হাঁটার সময়, পানি পানের পদ্ধতিতে, প্রতি ঘণ্টায় কত মিটার হাঁটা উচিত তা জানতে, তাঁবু স্থাপনের পদ্ধতি এবং ৫,০০০ মিটার অলটিচ্যুডে ঘুমানোর পদ্ধতিতে আমি তার দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছি।

কৈলাস তামাং: আমি আসলে কাউকে আরেকজনের সঙ্গে তুলনা করতে রাজি নই। প্রত্যেকেরই তার নিজের দক্ষতা, উজ্জীবনী শক্তি ও আগ্রহ রয়েছে। এটা ব্যক্তিবিশেষ যে আবহাওয়ায় জ?? নিয়েছে, যে পরিবেশে বড় হয়েছে এবং প্রশিক্ষণ নিয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে। মুসা খুব ভালো পর্বতারোহী নয়, আবার সে খুব খারাপও নয়। অন্য বাংলাদেশি পর্বতারোহীদের জন্য আমার পরামর্শ হলো, পর্বতারোহণে যাওয়ার আগে মুসার সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। তাদের হয়তো বা কিছু অতিরিক্ত টেকনিক্যাল ট্রেনিং দরকার এবং তাদের সাফল্য পেতে কীভাবে নিজেদের উজ্জীবিত রাখতে হয়, এ বিষয়ে তার (মুসা) পরামর্শ নিতে পারে। সাফল্য পেতে তার যে একাগ্রতা ছিল, তা তাকে আসলে ৮,৮৪৮ মিটারে নিয়ে গেছে।
« Day 53 
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact