Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 5
তিংরির দিকে যাত্রা- বেস ক্যাম্পের দিকে আরেক ধাপ
এপ্রিল ১২, ২০১০
৫ম দিন

ভোর ৬টা:
আগের রাতে তো আরামেই ঘুমিয়েছি। কিন্তু হোটেলের পাশের কক্ষে কয়েকজন সারারাত হয় আলাপে, নয়তো তাশ খেলে কাটিয়েছে। ফলে সেই কক্ষ থেকে সারারাত শব্দ এসে বারবারই ঘুম ভাঙিয়েছে। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠতেই শুরু হলো মাথাব্যথা। যেমন-তেমন ব্যথা নয়, মনে হচ্ছে যেন মাথাটাকে একটা বাড়ি মেরে কার্টুনের মতো করে সারিয়ে ফেলি। ঘটনাটা জানালাম সোম বাহাদুর আর কৈলাসকে। তারা বললেন, এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে যখন বুঝতে পারলে, তখনই তাদেরকে থামানো উচিত ছিল। উত্তরে বললাম- তাদের এই কাজ যে এ ধরনের শারীরিক সমস্যা ডেকে আনবে, সেটা তখন তো বুঝিনি।

আরও বিপদ হলো- আজই তিংরিতে যাওয়ার পরিকল্পনা। নায়ালাম থেকে তিংরি (উচ্চতা ১৪ হাজার ফুট) প্রায় সোয়া দুই হাজার ফুট উঁচু। ফলে এই উচ্চতাতেই যখন মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেল, সেটা তিংরিতে গিয়ে যে ভোগাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

যাই হোক, নাশতা সেরে সকাল আটটার মধ্যেই জিপে ব্যাগ তুলে রওয়ানা হলাম তিংরি। সব কিছু ঠিক থাকলে সাড়ে তিন ঘণ্টায় তিংরি পৌঁছে যাবো সবাই। চীনা সেনাবাহিনী কোদারি সীমান্ত থেকে একেবারে লাসা পর্যন্ত পথ যেন একেবারে কার্পেটের মতো করে মসৃণ তৈরি করে রেখেছে। কোথাও সামান্য ঝাঁকুনি লাগে না গাড়িতে। শুধু মাঝে মধ্যে বেরসিক গরু, ছাগল বা ভেড়া উঠে পড়লে জিপ ব্রেক কষলে যে মৃদু দুলুনি লাগে।

সকাল ৯টা:
রাতে ঘুম হয় নি। সেই সঙ্গে রয়েছে মাথাব্যথা। তাই নতুন জায়গার নতুন নতুন দৃশ্য দেখার স্বাভাবিক নিয়ম থাকলেও মাথাব্যথা ভুলে থাকতে এর মধ্যেই ইচ্ছে করে ঘুমিয়ে পড়লাম। তবে ঘুম বেশি দীর্ঘ হলো না। জীপ তিংরি গেটে থামতেই নেমে পড়লাম। বাংলাদেশে বিশেষ কোনো রাজনীতিককে তুষ্ট করার জন্য এলাকায় আগমণ উপলক্ষে যেমন জায়গায় জায়গায় তোরণ তৈরি করা হয়, তিংরি গেট হলো তিংরিতে যাওয়ার আগে সে ধরনের একটি তোরণ যা স্থায়ীভাবে ইস্পাত দিয়ে তৈরি। এই তোরণে বুদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের ?প্রেয়ার ফ্ল্যাগ? ঝুলিয়ে রেখেছে।

এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় সিসাপাংমা (উচ্চতা ২৬,২৮৯ ফুট, বিশ্বের চৌদ্দতম সর্বোচ্চ পর্বত), চো য়ু (উচ্চতা ২৬,৯০৬ ফুট, বিশ্বের ষষ্ঠতম সর্বোচ্চ পর্বত) এবং এভারেস্ট (উচ্চতা ২৯,০৩৫ ফুট) পর্বত। জিপ লালুং লা পাস পার হয়ে তিব্বতীয় মালভূমি?র একেবারে ন্যাড়া ও রুক্ষ এলাকায় অবস্থিত এই তিংরি গেটে থেমেছে। রাস্তার দু?পাশেই প্রায় ১০-২০ কিলোমিটার এলাকা একেবারে ন্যাড়া এবং দূর থেকে দেখতে প্রায় সমতল। এমনকি পর্বতের পাদদেশ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত কোথাও একটা পাথরের বোল্ডারও নেই। দেখে মনে হয় যেন পুরো এলাকাটাই একটা বড় কার্পেট। শুধু হাজার বছর আগে সৃষ্ট গ্লেসিয়ারের বরফগলা পানি থেকে গড়ে ওঠা স্রোতধারায় একেবারে চূর্ণ পাথরের টুকরা এদিক-ওদিক পড়ে আছে।

এসব দেখতে দেখতে ফের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল বাতাসে। মাথার ওপর সূর্য তখন কিন্তু গনগনিয়ে উঠেছে। তারপরও ঠান্ডা যেন থোরাই পরোয়া করছে সূর্যকে। দ্রুতই সবাই জিপে গিয়ে উঠে বসলাম। চালকও ফাকা রাস্তায় একশ ত্রিশ-চল্লিশ কিলোমিটার বেগে জিপ চালালেন তিংরির দিকে। এ সময় ইচ্ছে করেই আবার ঘুম।

তিংরির ঠিক আগে ঘুম ভাঙল। রাস্তার দু?পাশে গড়ে ওঠা বেশ কিছু বাড়িঘর নিয়ে তিংরি শহর। একটা হোটেলের সামনে ধুলা উড়িয়ে জিপ থামতেই যেই না নেমেছি, মনে হলো যেন ঠান্ডা বাতাস গায়ে হুল ফোটচ্ছে। এই বাতাসেই মাথা ব্যথা যেন আরেক ডিগ্রি চড়ে গেল। গাড়ির আওয়াজ শুনে হোটেলের ম্যানেজার বের হয়ে এলেন। হয়তো বা দেখে পছন্দ হলো না, তাই পাঠিয়ে দিলেন হোটেলের এক কোনায়। ইটের ঘর মাটি দিয়ে পলেস্তারা দেয়া হয়েছে। তবে বাতাস যাতে না ঢোকে, সে ব্যবস্থাটা করা হয়েছে মজবুত করে।

দুপুর ১২টা:
সেখানে ঢুকে ব্যাগ রেখেই মাথা ব্যথার একটা সুরাহা করার উপায় খুঁজতে লাগলাম। প্রথমে শেরপা পদ্ধতি- বেশি করে পানি বা চা পান। কিন্তু যখন মাথা ব্যথা একেবারে অসহ্য হয়ে উঠল সেই দুপুরবেলা, তখন নিজস্ব পদ্ধতিতেই মাথা ব্যথা সারানোর চেষ্টা চলল। প্রথমে পানিতে মাথা ধুয়ে ফেললাম। মাথা ধুবো- এ কথা শোনার পর সোম বাহাদুর গরম পানি নিয়ে এলেন একটা গামলায় করে যাতে করে প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে আবার কোনো সমস্যায় না পড়ি। সেই ফুটন্ত গরম পানিতে ঠান্ডা পানি মিশিয়ে তারপর মাথা ধোয়া হলো। কিছুটা যেন আরাম পেলাম।

এ বেলা দুপুরের খাবার খেয়ে সেই হু হু করে বয়ে যাওয়া বাতাসের মধ্যেই তিংরিতে চীনা সেনাবাহিনী নির্মিত চোমোলুংমা নেচার রিজার্ভ মনুমেন্ট দেখতে গেলাম। উদ্দেশ্যে তিংরি?র উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে অ্যাক্লেম্যাটাইজ করা। মূল সড়ক ধরে যখন যাচ্ছি, প্রচুর ইয়াক আর কুকুরের পাল চোখে পড়ল ইতি-উতি ঘুরে বেড়াচ্ছে খাবারের খোঁজে। কিন্তু খাবার এখানে বড়ই কঠিন এক বস্তু। সহজে মেলা ভার। তাই অনেক কুকুরছানাকে দেখলাম রাস্তার পাশের ড্রেনে মরে পড়ে আছে। কেউ কেউ বলছিলেন কুকুরছানাদের মা যেহেতু এগুলোকে তেমন দেখভাল করে না, তাই অনেক ছানাই ঠান্ডাতেও মারা গেছে।

সোম বাহাদুর জানালেন, চোমালুংমা নেচার রিজার্ভ মনুমেন্ট যে জায়গাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে, এখানে ছিল এ এলাকার সবচেয়ে বড় বুদ্ধমন্দির। চীনা সেনাবাহিনী সেই মন্দির প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। অভিযোগ ছিল তার চীনা বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতিকদের আশ্রয় দিয়েছিলেন।

চোমোলুংমা নেচার রিজার্ভ মনুমেন্ট থেকে চীনা সীমান্ত থেকে লাসা পর্যন্ত সড়ককে একটা সরু সরলরেখা বলে মনে হয়। এই তিংরি বিস্তীর্ণভূমির আরেক পাশে অনেক পুরনো বাড়িঘর। একটা বড় স্কুলও রয়েছে এখানে। এছাড়াও সব ধরনের নাগরিক সুবিধা এখানে পাওয়া যায়। যদিও শহুরে অনেক বিষয়াদি এখানে অনুপস্থিত, কিন্তু প্রায় চৌদ্দ হাজার ফুট উচ্চতায় বেশ গোছানো শহর বলেই মনে হলো তিংরিকে।

বিকাল ৩টা:
তিংরি শহরে ফিরেই খোঁজ করছিলাম কোনো জায়গা থেকে বাংলাদেশে ফোন করা যায় কি না। কেউ কোনো হদিস দিতে পারল না। একটা দোকানো গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই পাশের দোকানে যেতে বলে। ভাষাগত সমস্যার কারণে সবার মধ্যে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। সব শেষে একটা ফোনের দোকান খুঁজে পেলেও সেটা সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধই দেখলাম। আর কথা বলা হলো না রিমির সঙ্গে।

এ সময়ে বাতাসে ফের মাথা ব্যথা শুরু হলো। কিন্তু সোম বাহাদুর, লাকপা, লাল বাহাদুর আর কৈলাসকে বেশ স্বচ্ছন্দেই ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সোম বাহাদুর এবার ?নুন-চা? খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। তার পরামর্শ মেনে হোটেল থেকে বের হয়ে পাশের একটা টি-শপে গেলাম ?নুন-চা? খেতে। এই নুন-চা?র রেসিপি হলো- চা, গরম পানি, ইয়াক বাটার, চিনি আর লবণ। গরম পানি একটা ইস্পাতের চোঙের ভেতর ঢেলে তার মধ্যে চা, ইয়াক বাটার, চিনি আর লবণ দেয়া হয়। এর পর একটা ?ওয়াসার? দিয়ে চাপকল পাম্প করার মতো একটা হাতল দিয়ে সেই চা ইস্পাতের চোঙের ভেতর পাম্প করা হয়। এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় নুন-চা।

সোম বাহাদুরের মতে, এই তিব্বতীয় রেসিপি?র চা খেলে উচ্চতাজনিত মাথা ব্যথা তো সারেই, সেই সঙ্গে আরও কিছু শারীরিক সমস্যায় এটা নাকি বেশ কাজে দেয়। এজন্যই হয়তো নেপালের অনেক পার্বত্য ট্রেইলে বহু বুদ্ধধর্মীয় লোকজনকে এই চা খেতে দেখেছি।

চা খেতে খেতে গল্প চলছে তিব্বতীয় ভাষায়। আমি তার মুগ্ধ(!) শ্রোতা। এ সময় মন চলে যায় রিমি আর রাইদের কাছে। আব্বা-আম্মা আর বোনের কাছে। তারা কি করছে, কি ভাবছে এ সময়ে? সেখান থেকে চিন্তা ফের ডানা মেলে চলে যায় তিব্বত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে। সেখানে পৌঁছানো হয়তো আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। তাহলেই মূল দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারব। নামেই মূল দল। যার যার শেরপা নিয়ে যে যার মতো আরোহণ করবে এভারেস্ট। কিন্তু আয়োজনের সুবিধার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এভারেস্ট অভিযানের অনুমতি নিতে আন্তর্জাতিক দলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাতজনকে একটা দলভুক্ত করে।

সন্ধ্যা ৬টা:
চা খেতে খেতে সামান্য আরাম বোধ হলো। কিন্তু মাথা ব্যথা পুরোপুরি গেল না। এ অবস্থাতেই হোটেলে ফিরে ডাইনিং হলে গিয়ে বসলাম রাতের খাবারের অপেক্ষায়। উদ্দেশ্য রাতের খাবার খেয়ে একেবারে চলে যাবো হোটেল কক্ষে, রাত কাটাতে।

এখানেও খাবার-দাবারের সময় ?ইনজি?দের দিকে হোটেলের লোকজনের বিশেষ নজর। নায়ালাম এবং তিংরি- দু?জায়গাতেই খাবার-দাবার দেয়া হয় বিশেষ কায়দায়। স্যুপ খাওয়ার বাটিতে করে সবাইকে ভাত খেতে দেখলাম (আমাকেও ভাত খেতে হয়েছে এই বাটিতে)। আর বাঁশের তৈরি বিশেষ এক ধরনের (বালতির মতো দেখতে) বাটিতে করে ভাত দেয়া হচ্ছে। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- সিরামিকসের থালায় করে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ধরনের তরকারি- ডিম দিয়ে টমেটো, তিংরিতে চাষ করা মাশরুম, ক্যাপসিকাম দিয়ে সবজি, ইয়াকের গোশত ইত্যাদি। এলাহি খাবার-দাবার।

রাতে ঘুমাতে দেরি হলো। পর্বতে সাধারণত আট-নয়টা?র মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেও এদিন এগারটা বেজে গেল। তার ওপর গভীর রাতে মাথা ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেল। উপায়ান্তর না দেখে ঠান্ডা পানিতেই অর্ধেকটা ব্যথার ট্যাবলেট খেলাম অসহ্য ব্যথা থেকে রেহাই পেতে। এরপর বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করতে করতেই ঘুম।
« Day 4  Day 6 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact