Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 4
নায়ালামে বিশ্রাম
এপ্রিল ১১, ২০১০
৪র্থ দিন
ভোর ৬টা:
এক ঘুমে রাত কাটিয়ে সকালে বেশ চাঙ্গা লাগছে। রাতটাও বেশ নির্ঝঞ্ঝাট কেটে গেছে বলা চলে। তবে ভোর ৬টায় হাতমুখ ধুতে গিয়েই বিপত্তি। ঠাণ্ডায় মনে হয় যেন আঙ্গুল কেটে যাচ্ছে। কোনোমতে পানির কাজ সেরে হাত পকেটে ঢুকিয়ে ফেললাম। তবে বাথরুমে গিয়ে অবাক হলাম। প্রচুর প্রজাপতি বেসিনের ওপর পড়ে আছে। কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না এমন অসংখ্য প্রজাপতি এসে হাজির হওয়ার।

এদিন বিশ্রাম। অর্থাত উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে খাপ খাওয়ানোর জন্য নায়লামেই এদিন কাটানোর ব্যবস্থা। কিন্তু মন পড়ে আছে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে। যতো দিন না সেখানে গিয়ে হাজির হতে পারছি, মনকে কোনোভাবেই সুস্থির করতে পারছি না। শুধুই মনে হচ্ছে যে প্রতিযোগিতাটা শুরু হয়েছে, তাতে এখনো পিছিয়ে রয়েছি। কিন্তু এই ভাবনাগুলো শেরপাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি না। কারণ তারা না আবার অন্য কোনোভাবে নেয় বিষয়টা। যদিও আমার চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে তারা একাট্টা।

সকালের নাশতা সারা হলো রাতের হোটেলের রেস্টুরেন্টেই। টোস্ট, বাটার, ডিম, চা- ইত্যাদি সব খাবার নাশতায়। অনেক কষ্টে সেই টোস্ট গিলতে লাগলাম। ঠিক মনোপূত হলো না নাশতার মেন্যু। যদিও ইনজিদের জন্য এরা সর্বোচ্চ সেবা দেয়ারই চেষ্টা করছে।

এদিন সকালে দেখলাম নায়ালামের মূল বসতির মধ্য দিয়ে একটা রাস্তা গেছে। আরেকটা রাস্তা এর ওপরের পাহাড়ের গা ঘেষে চলে গেছে- বাইপাস হিসাবে। সব রাস্তাই পরিচ্ছন্ন। তবে বসতির মধ্য দিয়ে যে রাস্তাটা গেছে, তার দু'দিকেই বাসা-কাম-দোকান, নয়তো বাসা-কাম-হোটেল। আর একপাশের বাড়ি থেকে আরেকপাশের বাড়িতে প্রচুর বুদ্ধ-ফ্ল্যাগ ঝোলানো। তাতে বাতাস লাগতেই ফড়ফড় করে উড়ছে। যেন একটা 'মেলা মেলা' ভাব।

সকালের রোদ এখানে বেশ কোমল। দরজার চৌকাঠে বা বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে বুড়ো-বুড়িরা রোদ পোহাচ্ছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ আবার কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখানে একটা চীনা সেনাবাহিনীর ব্যারাক আছে। তাতে সেনাসদস্যরা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত। আরেকটা ভবনে দেখলাম চীনা পতাকা উড়ছে। কিন্তু পুরো ভবন তালাবদ্ধ। আর যেহেতু চীনা ভাষায় ভবনের নাম লেখা, সুতরাং এর কর্মবিধি উদ্ধার করা গেল না। এই সকালেই ট্রাক-জিপ-বাস এসে হাজির হচ্ছে নায়ালামে। আর ছেলেমেয়েরা যাচ্ছে স্কুলে। একেক স্কুলের পোশাক একেক রংয়ের। বেশ দেখতে।

সকাল ৯টা:
নাশতা সেরে সবাই চললাম নায়ালামের পাশের একটা পর্বতের মাথায় অ্যাক্লাম্যাটাইজেশন হাইকিংয়ের জন্য। এদিন ?গো হাই, স্লিপ লো? এই নিয়ম মানতে নায়ালাম (উচ্চতা ১১,৮০৮ ফুট) থেকে প্রায় তিনশ ফুট উঁচু আরেকটা পর্বতে চললাম সবাই। পর্বতের ঢাল বেয়ে সহজ উঠে যাওয়া। পর্বতের গায়ে ঘাস জন্মেছে। কিন্তু কোনো গাছপালা নেই, রুক্ষ। কাজেই এই পর্বত যে অক্সিজেন-স্বল্পতায় ভোগাবে, তা বেশ বুঝতে পারছি। বহুদিন পর ফের পর্বতে এসেছি। সেই যে ২০০৯ সালের ১৪ জুন অন্নপূর্ণা ফোর পর্বত জয় করেছি, এর পর আর কোনো পর্বতে যাওয়া হয় নি। আর এই অ্যাক্লেম্যাটাইজেশন হাইকিংও সেই অর্থে পর্বতারোহণ নয়। তারপরও অসাধারণ একটা অনুভূতি। তবে এই তিনশ ফুট উঠতেই হাপ ধরে গেল। বহুদিন অভ্যাস না থাকায় যা হয় আরকি।

এই পর্বতের ওপর থেকে নায়ালামকে ছবির মতো মনে হয়। যেন চারদিকে পর্বতে ঘেরা একটা গুহার মধ্যে গড়ে ওঠা এক আধুনিক পার্বত্য শহর। যেখানে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুত, পানি, রেশন সাপ্লাই, বেশ কিছু সরকারি অফিস, স্কুল ও কলেজ ইত্যাদি রয়েছে। আর সাপের মতো আঁকাবাঁকা সড়ক চলে গেছে তিংরির দিকে। আর নায়ালামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে নদী। এই নদী থেকেই আসলে পানির চাহিদা মেটায় নায়ালামবাসী। মোটা-শক্ত পাইপ দিয়ে পানি বাসা পর্যন্ত টেনে নিয়ে এসেছে। সেই পাইপগুলো চিকন সুতার মতো দেখা যাচ্ছে এই পর্বতের ওপর থেকে।

এই শহর থেকে মিলারপা গুহায় ছোট্ট মন্দির দেখতে যায় সব সাধারণ পর্যটক। এই গুহা সম্পর্কে বহুবার শুনেছি শেরপাদের কাছে। এখানে নাকি বুদ্ধ লামা?রা তাদের ধর্মীয় উপাসনা করতেন।

নায়ালাম নেপালী ব্যবসায়ীদের কাছে ?কুটি? নামে পরিচিত। এ জায়গাটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্থান হিসাবে সবাই ব্যবহার করছে। বেশ উর্বর ভূমিময় নায়ালাম উপত্যকায় বেশিরভাগই কাদা-ইট দিয়ে তৈরি বাড়িঘরে চীনের অন্য ভূখন্ড থেকে লোকজন এসে বসতি গড়ে তুলেছে। এখানে এই গ্রীষ্মে পর্বতের আশপাশের জঙ্গলে প্রচুর অ্যালপাইন জীবজন্তু চোখে পড়ে।

সেই পর্বতের মাথায় কিছু সময় কাটানো হলো উচ্চতার সঙ্গে শরীর যাতে খাপ খেয়ে যায়। এর মধ্যেই বাতাস বেশ জোরে বইতে শুরু করেছে। ছবি তোলার ফাঁকে গায়ে ফেদার জ্যাকেট ফের জড়িয়ে নিলাম। এমন সময় চোখে পড়ল সাইকেল চালিয়ে দু'জন পর্যটক যাচ্ছে তিংরির দিকে। ভাবলাম- এই একটা অ্যাডভেঞ্চার এখনো করার বাকি রয়ে গেল।

এরপর নেমে এসে খুঁজতে বের হলাম বাংলাদেশে ফোন করার সুবিধা কোথাও আছে কি না। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করার পর পাওয়া গেল একটা ফোন করার দোকান। রিমিকে ফোন করে জানালাম ভালো আছি। সেই সঙ্গে অনুরোধও করলাম যেন দুশ্চিন্তা না করে। কারণ সবাই বেশ যত্মআত্তি করছে। তখনও জানি না যে সেটাই হবে (১১ এপ্রিল, ২০১০) এভারেস্ট চূড়া থেকে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত রিমির সঙ্গে শেষ কথোপকথন। রিমি জানতে চাইলো যে কাউকে কিছু বলতে হবে কি না। তাকে বললাম কাকে কি বলতে হবে? সে ফের বলে- অনেকেই ফোন করেছে জানার জন্য যে আমি কেমন আছি? রিমিকে বললাম- যদি কেউ জানতে চায়, তাহলে বলে দিও যে ভালই আছি।

[এখান থেকে একটা চীনা মোবাইল ফোনের সিম কিনে যে সেটা ব্যবহার করতে পারতাম, সেই বুদ্ধিটা কেউ শিখিয়ে দিল না। দিলে অন্তত অ্যাকাউন্ট রিচার্জ করে করে বাংলাদেশে ফোন করা যেত। যেমনটা পরে দেখেছিলাম সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো'র পর্বতারোহীদের ব্যবহার করতে। তারা চীনা মোবাইল ফোনের সিম কিনে ইচ্ছেমতো দেশে ফোনে কথা বলেছে, ফোন রিসিভ করেছে।]

বেলা ১২টা:
দুপুরের খাওয়ার আগে দিনের বেলা নায়ালামে ঘুরেফিরে কেটে গেল। সকাল গড়াতেই সেই যে বাতাস শুরু হয়েছে, দুপুরের দিকে সেটা জোরে বইছে। বুদ্ধ ফ্ল্যাগ দেখতে এখন বেশ লাগছে। একটা উতসব উতসব ভাব। এমন সময় খাবারের ডাক পড়ল। ভাত, ডাল, সবজি, ডিম-টমেটো, মাশরুম ইত্যাদি দিয়ে খাবার বেশ ঝকমারি হলো।

এরপর সবাই গলায় জড়ানোর জন্য চক্রাকার স্কার্ফ কেনার জন্য বের হলাম। বেশ কয়েকটা দোকান ঘুরে একটায় পাওয়া গেল সেই স্কার্ফ। চীনা মুদ্রায় এই প্রথম কোনো জিনিস কিনলাম। এই স্কার্ফের সুবিধা হলো এটা বাধতে হয় না। শুধু গলা, কান বা নাকের ওপর টেনে চাপিয়ে দিলেই হলো। বাতাসের ঝাপটা বেশ ঠেকায়।

এই সময় নায়ালামের নিচে সেই নদীর ধার দিয়ে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে এলাম। দেখলাম এখানে জলবিদ্যুত প্রকল্প বানানোর প্রক্রিয়া চলছে। সেখানে প্রচুর মানুষ কাজ করছে। তাদের কর্মকাণ্ডে কিছুক্ষণ বুঁদ থেকে ছবি তুলে ফিরে চললাম হোটেলের দিকে।

বিকাল ৩টা:
বিকালের দিকে বাতাস ঠান্ডাকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পর্বতের ভাঁজের আড়ালে দ্রুতই সূর্যের হারিয়ে যাওয়া। সবমিলিয়ে ঠান্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে সবাই মিলে একটা হোটেলে চা খেতে ঢুকলাম। এখানে বহু ধরনের জিনিস রয়েছে বিক্রির জন্য। চা থেকে শুরু করে চামড়ার জিনিসপত্রও রয়েছে। চা খাচ্ছি আর গল্প-গুজব করে কেটে যাচ্ছে সময়।

সন্ধ্যা ৬টা:
রাতে হোটেল থেকে বের হয়ে খাওয়ার জন্য আরেকটা হোটেল যেতে যেই না বের হয়েছি, মনে হলো যেন কেউ আমাকে একটা ফ্রিজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। হোটেলে থাকতেই ঠাণ্ডা অনুভব করতে পারছিলাম। কিন্তু সেটার তীব্রতা টের পেলাম এই রাতে হোটেল থেকে বের হয়ে। এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে যেতে হয়তো এক মিনিটেরও কম সময় লাগলো। কিন্তু তার মধ্যেই ঠাণ্ডায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

এই রাতেই ঘটল বিপত্তি।
« Day 3  Day 5 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact