Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 20
সাকাং বাজারে সময় কেটে গেল
এপ্রিল ২৭, ২০১০
২০শ দিন

ভোর ৬টা:
এদিনও ভোরে ঘুম ভেঙ্গেছে হিমালয়ান কক-এর ডাকে। কিন্তু গত পরশুদিনের মতো হিমালয়ান ককের ছবি তোলার জন্য ঠান্ডার মধ্যে পাগলের মতো বের হয়ে পড়িনি। বরং তাঁবুর ভেতরে আড়মোড়া ভেঙ্গে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যেই ওম উপভোগ করছি। গত রাত থেকেই আবহাওয়া বেশ খারাপ। রাতে বেশ তুষারপাত হয়েছে। মাঝরাতে তাঁবুর ওপর খস খস শব্দে তুষারপাতের সময় ঘুম ভাঙ্গার পর বুঝতে পেরেছিলাম আবহাওয়ার অবস্থাটুকু। ক্ষণে ক্ষণে এখানে বদলে যায় আবহাওয়ার রং। তাঁবুর ওপর তুষারের স্তরের পুরুত্ব দেখে বোঝা যায় তুষারপাতের পরিমাণ। এসব দেখতে দেখতে এপাশ-ওপাশ করতে করতেই ঘড়িতে সময় দেখলাম ছয়টা পেরিয়ে গেছে। বাইরের অবস্থা বুঝতে তাঁবুর মাথার দিককার চেইন খুলে অবস্থা পরখ করার চেষ্টা করলাম। এদিন সকাল থেকেই আকাশ থমথমে। প্রথমেই খেয়াল করলাম গতরাতের খারাপ আবহাওয়ার জের এই সকালেও রয়ে গেছে। আর রাতে তুষারপাতের কারণে বেস ক্যাম্পের চারদিক সাদা। আর এই সকালে আকাশ বেশ মেঘলা। কিন্তু বাতাস রাতের মতো তেমন জোরালো নয়। খুবই সামান্য গতির চিরচির বাতাস। হঠাত করে এভারেস্টের দিকে চোখ ফেরাতেই চোখ যেন ছানাবড়া হয়ে গেল। গত রাতে তুষারপাত হওয়ার কারণে এভারেস্ট ও তার রিজ সাদা হয়ে আছে। আর মেঘলা আকাশের ভেতর দিয়ে হঠাত উঁকি দেওয়া মুখ বের করে রাখা এভারেস্টকে দেখতে যেন ছবির পটে আঁকা নিপুন কোনো চিত্রকর্ম বলে মনে হচ্ছে। এর ছবি না তুললেই না। যেমন ভাবা তেমন কাজ। দ্রুত স্লিপিং ব্যাগ ছেড়ে পায়ে ট্রেকিং সু গলিয়ে তাঁবু থেকে বের হয়ে পড়লাম।

দেখি যে এভারেস্টের রুক্ষ চেহারা তুষারপাতের ফলে অসাধারণ শুভ্র হয়ে রয়েছে। সেই সঙ্গে এর পাশের পর্বতের ওপরে মেঘ গলে সূর্যের আলো এসে পড়ায় প্রতি মিনিটে যেন নিত্যনতুন অপার্থিব সব মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে। এমন মোহনীয় এভারেস্টের ছবি তোলার জন্য টেন্ট এরিয়ার পাশে এক ঢিবিতে উঠে ছবি তোলার জন্য বের হয়েছি। সেই ঢিবির ওপর যেতেই এই সকাল সাড়ে ছ?টাতেই মন খারাপ করে দিল বয়স্ক এক বসনীয় সাইকিস্ট প্লাস ট্রেকার। সেই বসনীয় ট্রেকারও ক্যামেরা হাতে হাজির এভারেস্টের ছবি তোলার জন্য। আমিও সেখানে উপস্থিত হতেই পরিচয় বিনিময়ের পর সে যে মন্তব্য করল, তাতে যেন কেউ ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে দিল। তার প্রথম মন্তব্য হলো- ম্যান, ইউ আর ফ্রম বাংলাদেশ অ্যান্ড ইউ আর সারভাইভিং। কি বিষয়ে কথা বলছে তা ঠাহর করতে না পেরে বললাম, ইয়েস, উই আর ট্রাইং আওয়ার বেস্ট। তার দ্বিতীয় মন্তব্য যেন গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল- ?ইয়েস। ইউ আর। অ্যান্ড করাপশন এভরিহয়্যার- গভর্নমেন্ট অফিস, পাবলিক প্লেসেস, হোটেলস, এভরিহয়্যার। আহ্, ইউ আর সারভাইভিং।?

মনে হলো- এতোদিন দুর্নীতিতে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের নাম এক নম্বরে এসেছে। তা সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারও করা হয়েছে। কিন্তু এই বসনীয় ট্রেকারের মন্তব্য যেন একেবারে অহমে আঘাত করল গিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে কথা বেশিদূর এগোল না। বিদায় নিয়ে ডাইনিং টেন্টে এসে বসতেই রাজ্যের চিন্তা এসে ভর করে মনে। একটা দেশ হিসাবে বাংলাদেশ চলছে কিভাবে? একটা সরকার পাঁচ বছর দেশ চালানোর পর প্রতিবারই দেখা যায় বেশ কিছু দুর্নীতিবাজ লোকজনের ঠিকানা হচ্ছে কারাগারে। আবার অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার হয়ে যায়। অর্থাত তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সব মিথ্যা। এই এক ঘোরটোপে বাংলাদেশের মানুষ যেন বাধা পড়ে আছে। এ থেকে মুক্তি পাওয়া যেন আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার মতোই এক অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় ব্যাপার। সামান্য কয়েকটা দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকেই দেখেছি, প্রতিটি দেশের মানুষ তার দেশকে অসম্ভবরকম ভালোবাসে। তাদের দেশপ্রেম অসাধারণ। কিন্তু আমাদের দেশ নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। রাজনীতি আর নিজের আখের গোছানোই যেন সবকিছু। এ সময় ভাবি যে যদি একটা বছরও বাংলাদেশ চলতে পারত দুর্নীতিমুক্ত হয়ে, দুর্নীতিবাজদের দখলমুক্ত হয়ে, রাজনীতিবিদরা যদি অন্যের দোষারোপ করার আগে নিজের কাজের সমালোচনাটা করতে পারতেন, তাহলে অন্যদেরকে বলা সম্ভব হতো যে- দেখো, আমরাও পারি। এটা করা কি খুব অসম্ভব কিছু?

ডাইনিং টেন্টে বসে চা খেতে খেতে মাথা ঠান্ডা করলাম। মনকে বুঝ দিলাম- এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতেই হবে। এ কাজটা আমরাই পারবো, তরুণদেরকেই আসতে হবে নেতৃত্বে। তাহলেই জীর্ণ দশা থেকে উন্নয়ন ঘটবে দেশের। হয়তো বা সেই দিন খুব বেশি দূরে নেই। ভাবছি যে সরকারের কর্মকাণ্ডগুলোকেই যদি শুধু ইলেক্ট্রনিক ফরম্যাটে রুপান্তর করা যায়, তাহলে এদেশ থেকে দুর্নীতি অনেকটা কমে যাবে। বলা চলে একেবারে নব্বই শতাংশ কমে যাবে দুর্নীতি। আর সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ব্যক্তিবর্গ যদি তাদের অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের হিসাব ইলেক্ট্রনিক ফরম্যাটে নেওয়ার ব্যবস্থাটা চূড়ান্ত করতে পারতেন, তাহলে আমরা এগিয়ে যাবো এক ধাপে অনেকখানি।

এর মধ্যেই সবাই এসে ভিড় করছেন ডায়নিং টেন্টে। সবাইকে হাসিমুখে শুভসকাল বলে অভিবাদন জানাচ্ছি। সার্বিয়া, মন্টেনেগ্রো, তাইওয়ান এবং নেপাল- সবাই ডায়নিং টেন্টে আসার পর নাশতা দেয়া হলো। আগের মতোই হট চকোলেট ড্রিঙ্ক দিয়ে শুরু করে মধু দিয়ে পরিজ, এরপর পাউরুটি-ডিম ইত্যাদি দিয়ে নাশতা সেরে নিলাম।

সকাল ৯টা:
এদিনও বেস ক্যাম্পে বিশ্রাম। কিন্তু সকালেই সোম বাহাদুর প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন সাকাং বাজার পর্যন্ত ট্রেকিং করার। অর্থাত প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে এবং প্রায় এক হাজার ফুট উচ্চতা হারিয়ে এদিন সাকাং বাজারে গিয়ে সারাদিন কাটিয়ে আসা হবে। উদ্দেশ্য বেস ক্যাম্পের চিরাচরিত একঘেঁয়েমি থেকে মুক্তিলাভের চেষ্টা। আর আমি খুঁজে দেখব যে সাকাং বাজার থেকে বাংলাদেশে ফোন করার ব্যবস্থা আছে কি না। কারণ ১৫ দিন পার হয়ে গেছে, রিমি বা রাইদের কোনো খোঁজখবর জানি না।

সে মতে সকাল ন?টার দিকেই বের হয়ে পড়লাম সেই ঠান্ডা বাতাস আর তুষারপাতের মধ্যে। এদিন ডাউন জ্যাকেটের ওপর ওয়াটারপ্রুফ উইন্ডব্রেকার জ্যাকেট আর সাধারণ প্যান্ট পরে নিলাম। আর হাতে থাকল গ্লভস, মাথায় সাধারণ উলের ক্যাপ। সঙ্গী হলেন লাকপা নুরু শেরপা। বেস ক্যাম্প পার হতেই একটা শীর্ণকায় পানির ধারা সামনে হাজির হলো। একে কি নালা বলবো, নাকি খাল, নাকি নদী- বুঝতে পারলাম না। কারণ যে জমে যাওয়া নদীর বেডের বরফ আইস এক্স দিয়ে খুড়ে পানি বের করে, নয়তো পানির ধারা থেকে পাইপ দিয়ে ড্রামের ভেতর পানি সংগ্রহ করে বেস ক্যাম্পে ব্যবহারের জন্য নিয়ে আসা হয়, সেই নদীই এই পানির ধারার উতস। কিন্তু ধারা এতো সরু যে ঠিক কোনো ফরম্যাটেই একা ফেলা গেল না। তবে সরু হলেও এটা বেশ ঘামিয়ে ছাড়ল। কারণ পানি প্রচন্ড ঠান্ডা। সেই পানিতে যদি কোনো মতে পা ডোবে, তাহলে আর দেখতে হবে না। এমনিতেই চারদিক ঠান্ডা, তার ওপর চরম ঠান্ডা মাত্র বরফ গলে নেমে আসা এই পানি। এতে পা ডুবলে আর রক্ষা নাই। তাই পা বাঁচিয়ে সেই স্রোতের মধ্যে মাথা তুলে রাখা পাথরের ওপর পা রেখে কোনো মতে পার হয়ে গেলাম। এই পানির ধারা পার হতেই একটা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্প এরিয়া। সেটার দিকে দেখিয়ে সোম বাহাদুর বললেন, এটাই মুহিতের এশিয়ান ট্রেকিং কোম্পানির টেন্ট এরিয়া।

সেই এলাকা পার হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চায়নিজ আর্মির চেকিং ক্যাম্পে গিয়ে হাজির হলাম। আমাদের দেখে চায়নিজ আর্মির জওয়ানরা জিজ্ঞেস করল কোথায় যাচ্ছি? সোম বাহাদুর সবার পরিচয় দিয়ে জানালেন, আমরা এভারেস্ট অভিযাত্রী। এখন সাকাং বাজারে যাচ্ছি।

শুনে ক্যাম্পের জওয়ানরা পাসপোর্ট দেখতে চাইল। কিন্তু কেউই তো পাসপোর্ট সঙ্গে রাখিনি। সেটা রয়ে গেছে এবিসিতে। এসব কথাবার্তা চলছে, আর আমি উপভোগ করছি সোম বাহাদুরের কর্মকান্ড। কারণ চায়নিজ আর্মি কথা বলছে চায়নিজ ভাষায়। সোম বাহাদুরও কিভাবে যেন তাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে অনেকটা জোকারের মতো হেসে হেসে। পরিস্থিতি তাদেরকে ফের ব্যাখ্যা করার পর জওয়ানরা সঙ্গে পাসপোর্ট রাখার ব্যাপারে সাবধান করে ছেড়ে দিল। সোম বাহাদুর অল্পেই চীনা সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ায় খুব খুশি।

এরপর শর্টকাট পথ ধরে একটানা হেঁটে চলে চললাম সাকাং বাজারের দিকে। বেস ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার সময় আকাশ মেঘলা ছিল। কিন্তু চায়নিজ আর্মির ক্যাম্প পার হওয়ার পরই তীব্র তুষারপাত শুরু হয়েছে। পরনের ওয়াটারপ্রুফ উইন্ডব্রেকার জ্যাকেটটা এ সময় বেশ কাজে দিল। জ্যাকেটের গায়ে পেজা তুলার মতো তুষারগুলো এসে পড়ছে। তুষার জ্যাকেটের গায়ে লেগে গলে যাচ্ছে। ভাবছিলাম যে এভাবে গলতে গলতে যে জ্যাকেট ভিজে যাচ্ছে, তাতে আবার ভেতরের জামাকাপড় ভিজে না যায়। মূল সড়ক ছেড়ে উপত্যকার মাঝ বরাবর পায়ে হাঁটা পথে এগিয়ে চলেছি সাকাং বাজারের দিকে। চারদিকে হোয়াইট আউটে (পর্বতে মেঘ বা কুয়াশা এসে চারদিক ঢেকে দেয়াকে বলে হোয়াইট আউট) ঢেকে গেছে। কখনও তা একেবারে গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। কখনও এই মেঘ পর্বতের মাথা বরাবর উড়ে যাচ্ছে। তখন রুক্ষ চেহারার পর্বতের চূড়া মোহনীয় হয়ে ধরা দেয়। এসব চোখে পড়ে আর ক্যামেরা শরীরের ভেতর থেকে বের করে ছবি তুলি তুষারপাতের হুমকিকে উপেক্ষা করেই। তুষারপাতের মধ্যেই ক্যামেরা বের করলে অনেক সময় লেন্সের মধ্যে গিয়ে তুষার ঢুকে পড়ে। তখন আবার তা গলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। গলে গেলে টিস্যু পেপার দিয়ে তা শুষে নিয়ে পানি দূর করার ব্যবস্থা করতে হয়।

সাকাং বাজারের ঠিক আগেভাগে পড়ল জা রুম্বুক মনাস্ট্রি। এই মনাস্ট্রি থেকে সাকাং বাজার হয়তো দশ মিনিটের রাস্তা। এ পথে অনেকগুলো জায়গায় বেশ কিছু পাথরকে এক করে রাখা হয়েছে। সোম বাহাদুর জানালেন, এখানে পর্বতের আশেপাশে অনেক জায়গাতেই কিছু কালো গোল পাথর যেসব পাওয়া যায়, সেগুলোতে ফসিল থাকে। অর্থাত কয়েক হাজার কোটি বছর আগে যে এই হিমালয় পর্বতমালা সমুদ্র থেকে সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সামুদ্রিক জীবের ফসিল পাওয়া যায় এখানকার পর্বতের পাথরগুলোতে। এই পাথর এখানে জমা করে রাখা পাথরের মধ্যে গনগনে আগুনে ছেড়ে দিয়ে প্রচন্ড গরম করে ঠান্ডা পানিতে ডোবালেই ফসিল বরাবর তা ফেটে যায়। এই ফসিল সংগ্রহ করেন এখানে আসা সৌখিন পর্যটকরা। এখানে হাঁটতে হাঁটতে একটা অবহেলায় ফেলে রাখা ফসিল পেয়ে গেলেন লাকপা নুরু শেরপা। পেয়ে তিনি আমাকে দিলেন সেটা উপহার হিসাবে। অবহেলায় পড়ে থাকা এই ফসিলটাই আমার কাছে অনেক বড় বিষয়। চুলু ইস্ট পর্বতাভিযানে হাই ক্যাম্পে এমন একটা ফসিল খুঁজে পেয়েছিলাম। এবার পেলাম আরেকটা। বেশ ভালো সংগ্রহ হচ্ছে ফসিলের।

এমন সময় দেখি একটা বাস চলছে মূল সড়ক ধরে বেস ক্যাম্পের দিকে। আরোহীরা হলেন চায়নিজ ক্যাম্পের ঢিবি থেকে এভারেস্ট দেখতে আসা পর্যটক। কিন্তু এই হোয়াইট আউট আর তুষারপাতের মধ্যে কি কারণে তারা হোটেল ছেড়ে বের হয়ে বেস ক্যাম্পের দিকে চলছেন, তা বুঝতে পারলাম না। যাই হোক, এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাদের এই কর্মকাণ্ড ক্যামেরায় ধরে রাখলাম।

বেলা ১২টা:
এসব দেখতে দেখতে সাকাং বাজারের দিকে হাজির হলাম। একটা স্টেডিয়ামের চারদিকে যেভাবে গ্যালারি গড়ে ওঠে, ঠিক সেভাবেই একটা পাথুরে মাটিময় মাঠের চারদিকে অনেকগুলো ঘর একেরপর এক গায়ের ওপর গড়ে উঠেছে। সবগুলো ঘর আবার বাইরের দিকে কালো কাপড় দিয়ে মোড়ানো। অর্থাত এখানে ঠান্ডা থেকে রেহাই পেতে রোদকে সর্বোচ্চ পরিমাণে শোষণ করে ঘর গরম রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে সবাই। সেই সঙ্গে প্রতিটা ঘরের মধ্যে কাঠ বা গোবর জ্বালিয়েও ঘরগুলো গরম রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘর নাকি একেকটা করে হোটেল এবং সেই সঙ্গে রেস্টুরেন্টও। রুম হিটারের পাশে বসে খাওয়া-দাওয়া করার ব্যবস্থা এবং রুমের ভেতরে চারদিকে ঘুমানোর আয়োজনও করা আছে। প্রায় প্রতিটা হোটেলের সামনেই সেই ফসিল, বিভিন্ন ধরনের তিব্বতীয় অ্যান্টিক বস্তু সাজিয়ে রাখা হয়েছে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য।

সাকাং বাজারে একটাই মাত্র ফোন করার ঘর রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো ফোন নেই। তাই যে সুযোগের আশায় এসেছিলাম, তা পাওয়া গেল না। তবে দেখলাম এই হোয়াইট আউট আর তুষারপাতের মধ্যেই সাকাং বাজারের ছেলেপেলেরা বল খেলায় মেতে উঠেছে। বল খেলা মানে হলো- কে কতো জোরে বল মেরে বলকে কতো ওপরে পাঠাতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা। ক্যামেরায় তাদের এই খেলা বন্দি করলাম। একবার হঠাত বল দেখি আমার দিকে আসছে। এ সময় ক্যামেরা বন্ধ করে আমিও তাদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠলাম। কিন্তু বলে কয়েকটা শট দিতেই বুঝলাম এখানে কোনো কাজ করতে গেলেই কি পরিমাণ দম লাগে। আরও কয়েকটা শট দিয়ে হাপাতে লাগলাম।

দেখি যে এই হোয়াইট আউট আর তুষারপাতের মধ্যেই স্নো পকেট, কবুতর ইত্যাদি পাখি মাটিতে খুটে খাবার খাচ্ছে। স্নো পকেট হিমালয়ের মনে হয় জাতীয় পাখি। কারণ হিমালয়ের যতোগুলো এলাকায় গেছি- সিকিম হিমালয়, নেপালের সোলু খুম্বু হিমালয়, মেরা হিমালয়, অন্নপূর্ণা হিমালয়, লাংটাং হিমালয় এবং এই তিব্বত হিমালয় - সব জায়গাতেই এই স্নো পকেট পাখিটাকে দেখতে পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকিংয়ের সময় এক লোবুচে'র এক স্থানীয় বলেছিলেন- স্নো পকেট পাখি দেখে ঠান্ডা আগমণবার্তা বোঝা যায়। কিভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন যে এই পাখিটা সাধারণত অনেক ওপরে বাস করে। প্রায় ১৬-১৭ হাজার ফুট উচ্চতায়। কিন্তু যখন সেই উচ্চতায় অনেক বেশি ঠান্ডা পড়ে, তখন এই পাখিটা নিচে নেমে আসে। স্নো পকেট পাখিটার এমন গতিবিধি দেখে অনেক সময় পর্বতে ঠাণ্ডার আগমণবার্তা বোঝা যায়। ক্যামেরায় আমি এই স্নো পকেট, কবুতর ইত্যাদি পাখির কর্মকাণ্ড তুলে রাখলাম।

এদিন ছিল সম্ভবত এভারেস্ট অভিযানে সবচেয়ে মজার দিন। কারণ একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে সোম বাহাদুর চা খায় তো, আরেকটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে দেয় আলু সেদ্ধ?র অর্ডার। এরপর আরেকটা রেস্টুরেন্টে প্যাক করা ?চিকেন উইংস? খায় তো আরেকটায় দিল আস্ত মুরগির ভুনার অর্ডার। সোম আর লাকপার সঙ্গে ঘুরে বেড়াই আর তাদের কান্ডকীর্তি দেখি। এরপর অন্য একটা হোটেলে ঢুকে চলল বেশ অনেকক্ষণ গালগল্প।

বেলা ৩টা:
রিমি আর রাইদের সঙ্গে কথা হলো না। একটু পরপর ফোন দোকানের খোঁজ নিলেও তা বরাবরের মতো বন্ধ পেয়েছি। আসলে এ এলাকায় কেই বা আসবে ফোন করতে? বেলা তিনটার দিকে ফিরতি পথ ধরলাম সবাই। এবার সোম জা রুম্বুক মনাস্ট্রিতে ঢুকলেন। তার উদ্দেশ্য এখানে লামার সঙ্গে দেখা করে তার কাছ থেকে আশীর্বাদ নেয়া। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম সেই মনাস্ট্রি?র ইতিহাস। হিমালয়ের সবচেয়ে বড় পর্বতের পাশে গড়ে ওঠা এই উপাসনালয়ে গুরু পত্মসম্ভাবা তার ধ্যান করেছেলেন। এই উপাসনালয়ের ভেতরে কিছু গুহা রয়েছে যেখানে পত্মসম্ভাবা?র মূর্তি, হাত ও পায়ের ছাপ রয়েছে। এই উপাসনালয়ের অন্যান্য গুহার ভেতর রংবু নামগিয়াল সাংপোসহ আরো অনেকেই ধ্যান করেছেন। এই জা রুম্বুক উপাসনালয়ের আশপাশের পর্বতের গুহাতেও অনেক পবিত্র জায়গা রয়েছে বলে এ এলাকার বুদ্ধ ধর্মীয় লোকজন বিশ্বাস করে। এসব এলাকায় এসে তারা বুদ্ধের আশীর্বাদ পাওয়ার চেষ্টা করে এবং মনের ইচ্ছা অনুযায়ী যা কিছু চাইতে পারে।

এই মনাস্ট্রিতে বেস ক্যাম্পের প্রার্থনাকারী সেই লামার সঙ্গে দেখা হলো। তার সঙ্গে সোম বাহাদুরের বেশ খাতির। কারণ তার সঙ্গে আগেই সোম দেখা করেছেন। সবাই মনাস্ট্রিতে এর ভেতর গুহা ঘুরে দেখতে লাগলাম। কেমন যেন গা ছমছম করে। আর মনাস্ট্রি?র গুহার ভেতর আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বালিয়ে। এসব দেখে সেই লামার সঙ্গে একটা ঘরে গিয়ে বসলাম। তিনি সবার জন্য ?নুন-চা?য়ের ব্যবস্থা করলেন। এবার তিনি ছাগলের একটা ছালে ছাতু গুলিয়ে নিয়ে খেতে শুরু করলেন। সবশেষে সবার জন্য শুভকামনা জানালে বিদায় নিলাম তার কাছ থেকে। এরপর মনাস্ট্রি?র চারপাশ ঘুরে ফিরে চললাম বেস ক্যাম্পের দিকে। ফিরতে ফিরতে তুষারপাতের পরিমাণ বেড়েই চলল।

হাঁটতে হাঁটতে সোম বাহাদুর জানালেন, আগে সাকাং বাজার বেস ক্যাম্পের সঙ্গে লাগোয়া ছিল। কিন্তু তখন শেরপারা এই হোটেলের বাজারে গিয়ে রাতের বেলা সুরাপানে বুঁদ হয়ে থাকতো। ফলে পরদিন যখন বেস ক্যাম্প থেকে ওপরের দিকে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসতো, তখনো সেই শেরপাদের খুঁজে পাওয়া যেত না। তাই সিটিএমএ বাধ্য হয়ে এ সমস্যা থেকে পর্বতারোহী দলকে নির্বিঘ্ন রাখতে সাকাং বাজার বর্তমান জায়গায় পুনস্থাপন করেছে।

এমন সময় দেখি সেই হোয়াইট আউট আর তুষারপাত এভারেস্ট চূড়ার দিকে থেমে গেছে। সেখানে সূর্যের আলোও এসে পড়েছে। ফলে এভারেস্ট দেখতে অনেক মোহনীয় লাগছে। পর্বতে বহুবার লক্ষ্য করেছি- শুধু রুক্ষ, মার্কামারা পর্বত একেবারে খালি খালি ভালো লাগে না। কিন্তু এমন হোয়াইট আউটে, তুষারপাতের মধ্যে, পর্বতের মাথায় মেঘের লুকোচুরির মধ্য দিয়ে পর্বতকে সবচেয়ে উপভোগ্য লাগে। এভারেস্টকেও এখন তেমনই লাগছে। ভাবলাম যে সাধারণ ট্যুরিস্টদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো তাহলে। নাহলে এতো কষ্ট করে এভারেস্ট দেখতে আসাটা বৃথাই যেত।

বেস ক্যাম্প পৌঁছতে পৌঁছতে পেজা তুলার মতো তুষারে যেন একেবারে ভিজে গেলাম। লাকপা এ সময় চায়নিজ আর্মি ক্যাম্প লাগোয়া এশিয়ান ট্রেকিং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শেরপাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। বেস ক্যাম্প ফিরে জানালেন, আজ মুহিত বেস ক্যাম্পে নেমে এসেছে এবিসি থেকে।

সন্ধ্যা ৬টা:
বেস ক্যাম্পে আজ হট্টগোল আরও বেড়েছে। কারণ এদিন ২৯ জন বৃটিশ পর্বতারোহীর পুরো দল নেমে এসেছে। আর তাদের ডায়নিং টেন্ট থেকে আগের মতোই কোলাহল ভেসে আসছে। তারা হৈহুল্লোড় করছে। টিভি দেখছে। যেন কারো বাড়িতে পার্টিতে মশগুলে সবাই। সন্ধ্যার ঠিক আগে দিয়ে দেখি যে তুষারপাত কিছুটা কমে গেল। কিন্তু তাঁবুর ওপর বরফ জমেছে এদিন।

সবমিলিয়ে এক ভিন্নরকম দিন কেটে গেল। কিন্তু মনটা খচখচ করছে রিমি আর রাইদের জন্য। একবার ভাবছি যে যাই, ভোলাকে না হয় আরেকবার বলি যে তার ফোনটা ব্যবহার করতে চাই। কিন্তু পাছে লোকে কিছু বলে, এই আশঙ্কায় কথাটা বলা হয়ে ওঠে না ভোলাকে।

রাতে আমার মেন্যুতেই থাকলাম। অর্থাত চিড়া ভাজা দিয়ে ডিনার সারা হলো। কিন্তু অন্য সব পর্বতারোহীরা কিচেন স্টাফদের তৈরি ইউরোপীয় মেন্যুতেই ডিনার সারলো। আমার এসবে হাফ ধরে গেছে। এখন খাবার-দাবারে বেশ ঝাল না হলে তা আর মুখে রোচে না। খেয়ে দেয়ে প্রচুর পানি আর চা খাওয়ার পর চললাম তাঁবুর দিকে, রাতের ঘুমের আয়োজন করতে।
« Day 19  Day 21 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact