Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 19
গ্লেসিয়াল লেক, অ্যাভেলান্স, শেরপার অসুস্থতা
এপ্রিল ২৬, ২০১০
১৯শ দিন

ভোর ৬টা:
এদিন অবশ্য বেশ দেরি করেই ঘুম ভেঙ্গেছে। ঘুম থেকে উঠলাম সকাল সাতটায়। তখনও সোম বাহাদুর ঘুমাচ্ছেন। অবশ্য বেস ক্যাম্প পুরোপুরি জেগে উঠেছে। আর গতকাল প্রায় সব পর্বতারোহী আর শেরপারা বেস ক্যাম্পে নেমে আসার ফলে এই সাতসকালবেলাতেও বেস ক্যাম্প যেন গম গম করছে সবার কথাবার্তায়। এ কারণে একটু আলসেমি করার ইচ্ছা থাকলেও তাদের কথাবার্তার শব্দে আর টিকে থাকা গেল না। তবুও শুয়ে থাকা অবস্থাতেই তাঁবুর যেদিকে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েছি, সেদিককার চেইন খুলে এভারেস্টকে দেখছি। গতকাল রাতে তুষারপাত হওয়ায় বেস ক্যাম্পের চারদিক সাদা হয়ে আছে। আর রুক্ষ এভারেস্টও সাদা। তার রিজেও তুষারপাত হয়ে পুরো এলাকা সাদা হয়ে আছে। এ সময় হালকা চির চির করে বাতাস বইছে। সেটাই চোখে এসে লাগায় চোখ খচ খচ করছে। তাই বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা গেল না। তাঁবুর ভেতরে থাকা অবস্থাতেই বুঝতে পারছি যে তাঁবুর আউটার শেল-এ বরফ জমে আছে। একবারে ওপরে অনেকগুলো বরফ। শুয়ে শুয়ে পা দিয়ে সেটাই সরাচ্ছি। নাই কাজ তো খই ভাজ আর কি। এই শব্দেই সোম বাহাদুর জেগে উঠলেন। আমার কর্মকাণ্ড দেখে তিনি হাসেন। ঠাট্টা করে বলেন- মুসা, আজ রাতে তো ভালোই ঘুমালে। বাসাতেও কি এমন ঘুমাও? বুঝতে পারলাম ঠাট্টার মেজাজে আছেন। আমিও পাল্টা খোঁচা দিলাম তাকে। বললাম- সোম জি, ওঠেন। উঠে দাঁত ব্রাশ করেন। দেখেন চারদিক কেমন সাদা হয়ে আছে। এখন আপনিও দ্রুত দাঁত মেজে পরিচ্ছন্ন হয়ে নিন। নয়তো প্রকৃতির সাদার সঙ্গে আপনাকে বেমানান লাগবে। এবার সোম জি হাসেন। আমাদের কথাবার্তা শুনে লাল বাহাদুর জিরেল এবার তাঁবুর পায়ের দিককার চেইন খুলে খোঁজ নিতে এলেন। তাকে বললাম ভেতরে আসতে। তিনি তাঁবুর ভেতরে ঢুকলে তাকে চকোলেট খেতে দিলাম- এই সাতসকালের আপ্যায়ন। অবশ্য চকোলেট হাতে নেয়ার আগে বললেন- প্রচুর পানি আর চা খেয়েছেন। এখন আর চকোলেট খেতে চান না। কিন্তু এই সকালবেলার অতিথিকে আপ্যায়ন না করে কেমনে ফিরিয়ে দেই? তার সঙ্গে বহু বিষয়ে আলাপ হলো অনেকক্ষণ। তার অগ্রগতি, আমার অগ্রগতি, পুরো দলের টিমওয়ার্ক ইত্যাদি নিয়ে বেশ অনেক আলাপ হলো। এই যে তুষারপাত, প্রচণ্ড বাতাস ইত্যাদি সম্পর্কে তিনি বললেন- মুসা, নর্থ ফেসে এরকমই থাকে। কিন্তু এর মধ্য দিয়েই আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। তার কথা শুনে ভাবছি- গতকালই তো মনে মনে আমি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তবেই এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছানের চেষ্টা করতে হবে। এর মধ্যে অবশ্য লাল বাহাদুর জিরেলের সঙ্গে বেশ সখ্যতা হয়ে গেছে। অনেক বিষয় নিয়েই তার সঙ্গে আলাপে মেতে উঠি।

এবার নাশতা করার ডাক পড়ল। ডায়নিং টেন্টে নাশতা করার সব আয়োজন করে রাখা হয়েছে। সেই বিস্বাদ পরিজ, পাউরুটির টোস্ট, ডিম ইত্যাদি দিয়ে নাশতা। মধু মিশিয়ে পরিজটুকু খেয়ে ফেললাম। কিন্তু এই বেস ক্যাম্পে মুখের ভেতরের চামড়া যেন অনেক পাতলা হয়ে গেছে। ফলে পাউরুটির টোস্ট মুখের ভেতর বহু জায়গায় চামড়া ছিন্নভিন্ন করে দিল।

সকাল ৯টা:
নাশতা শেষ করেই ডায়নিং টেন্টের বাইরে চলে এলাম। চোখে রোদ-চশমা। চারদিকে চোখ বুলাচ্ছি। এভারেস্টের চূড়ায় আজ প্লুম তৈরি হচ্ছে না। কিন্তু বাতাস মাঝে মধ্যেই চির চির বয়ে যাওয়া পরিস্থিতি থেকে প্রচন্ড রূপ নিচ্ছে। সোম বাহাদুরকে বললাম- চলুন, লেকের পানিতে এভারেস্টের প্রতিফলনের ছবি তুলে আসি। কিন্তু সোম বাহাদুর তাতে বাদ সাধলেন। বললেন আমাকে একাই যেতে। এবার কৈলাসকে বলবো কি না ভাবছি। লাল বাহাদুর সামনে আসতেই তাকেও একই প্রস্তাব দিলাম। কিন্তু তিনি বিশ্রাম নিবেন জানিয়ে অপারগতা প্রকাশ করলেন। অগত্যা একাই যাওয়ার জন মনস্থির করলাম। বেস ক্যাম্পে বসে থাকার চেয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানোর দিকেই সবাই উতসাহ দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু কেউ সহযোগী হতে চান না। যাই হোক।

এদিনটা যে ঘটনাবহুল একটা দিন হবে, তা কে জানতো? শুরুটা হলো লেক দেখতে গিয়ে। গতকালই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম যে এদিন সকালে নাশতার পর বেসক্যাম্প থেকে এভারেস্টের দিকে ডায়নামিক মোরেনের ওপর গড়ে ওঠা ?গ্লেসিয়াল লেক? বা হিমবাহ গলা পানিতে সৃষ্ট লেকের ছবি তুলব। মূল উদ্দেশ্য ছিল এখানকার লেকগুলোর ওপর এভারেস্টের যে প্রতিফলন পড়ে, তার ছবি তোলা। এজন্য বেস ক্যাম্প থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোতে শুরু করলাম। সঙ্গে থাকল এক বোতল পানি, ক্যামেরা আর চকোলেট। পরনে ডাউন জ্যাকেট, মাথায় সাধারণ ক্যাপ আর সেই যে নায়ালামে গোলাকার স্কার্ফ কিনেছি, সেই স্কার্ফ। অবশ্য এই স্কার্ফ নায়ালামের পর আর এক মুহূর্তও গলা থেকে নামাই নি। প্রথমে বেস ক্যাম্পের বিস্তীর্ণ এলাকা পার হয়ে গেলাম প্রায় পনের মিনিটে। এরপর শুরু হয়ে গেল টিলা সমান উচ্চতায় থাকা ডায়নামিক মোরেনের ওপর পাথুরে ঢিবি। এর ওপরে কিভাবে ওঠা যায়? কারণ ঢিবির গা বেশ ঢালু। এর গা বেয়ে উঠতে গেলে নির্ঘাত গড়িয়ে পড়ে যাবো। কিন্তু এর ওপরে না উঠলে লেকের ছবি তুলব কিভাবে? পথ খুঁজে না পেয়ে তাই এদিক-ওদিক কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। একটু পর দেখতে পেলাম পায়ের ছাপ। অর্থাত লেকের ওপর ছবি তোলার পাগলামি এর আগেও বহু মানুষকে পেয়ছিল। সেই পথ ধরে কিছুদূর এগোতেই দেখি কোনো লেক তো চোখে পড়ে না। তাহলে? এবার লেকের খোঁজ চলল কিছুক্ষণ। এরপর পেয়ে গেলাম বহু লেকের খোঁজ। কিন্তু বিধি বাম। লেক তো পেলাম। কিন্তু এই সকাল সাড়ে দশটার দিকে লেকের ওপর দিয়ে বাতাস তার জোরে বয়ে চলেছে। সুতরাং পানিতে স্থিরতার বদলে কখনো শিশুসুলভ দুলুনি, আবার কখনো তার ভঙ্গি প্রবল পেশাদারী। এসব দেখে লেকের পাড়ে পাথরের ওপর বসলাম। চলল অপেক্ষা, কখন বাতাস স্থির হবে তার জন্য। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে লেকটা ৬০ ফুট বাই ৩০ ফুট হবে। এর পানি একেবারে কাঁচের মতো স্বচ্ছ নীল। একেবারে ঠিক মাঝে এতই গভীর যে তলদেশ দেখা যায় না। তবে লেকের চারধারে পানির নিচে পাথরের অলস সমর্পন। পাথরের ওপর বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি যেন বাতাসের পাগলপনা থামে, বাতাস যেন তার গতিতে একটু রাশ টেনে ধরে। পানি যেন একটু স্থির হয়। কিন্তু হলো না। বরং গতি যেন আরও বেড়ে চলল প্রতি মুহূর্তে।

বেলা ১২টা:
বেলা বারটার দিকে এই প্রচেষ্টায় ক্ষান্ত দিয়ে বেস ক্যাম্পে নেমে এলাম। তার আগে এই ডায়নামিক মোরেইনের ওপর চীনা কর্তৃপক্ষের গড়ে তোলা আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ?গ্লেসিয়াল লেক?-এর পরিস্থিতি বোঝার জন্য আধুনিক সরঞ্জামসহ স্থাপনায় ঢুঁ মারলাম।

বেস ক্যাম্পে পৌঁছার মিনিট পনের পরেই ভোলা খবর নিয়ে এল নর্থ কোল-এ অ্যাভেলান্স হয়েছে আনুমানিক দশটার দিকে। তাতে এশিয়ান ট্রেকিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাওয়া পর্বতারোহীদের একজন মারা গেছেন, আরেকজন আহত হয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। খবরটা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল- এশিয়ান ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে তো আরেক বাংলাদেশী মুহিত এভারেস্ট অভিযানে এসেছেন। তার আবার কিছু হলো না তো? কিছুক্ষণ পর যখন খবর পেলাম যে তিনি সুস্থ আছেন, শুনে মনটা নির্ভার হলো। কারণ বাংলাদেশের পর্বতারোহী গোষ্ঠীসহ পুরো দেশবাসী এখনো পর্বতারোহণে কোনো দুর্ঘটনার কথা শোনেননি। তাই তারা এমন কিছু সহজভাবেও নিতে পারার কথা নয়। আর কোনো বাংলাদেশী এখনও পর্বতারোহণে কোনা বড় দুর্ঘটনার শিকার হননি দেখেই হয়তো আজ আমি এখানে। অর্থাত- সবাই জানেন যে পর্বতারোহণে দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু কেউ যেহেতু নিজেই এমন পরস্থিতির মুখোমুখি হইনি, তাই হয়তো সেই দুর্ঘটনার প্রসঙ্গগুলো সযত্নে এড়িয়ে প্রতিবার পর্বতারোহণ অভিযানে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।

এই বরফধ্বসের শিকার হয়েছেন হাঙ্গেরীর এক পর্বতারোহী। তারা নাকি প্রতিবছরই এ রুট দিয়ে অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট পর্বত জয়ের চেষ্টা করেন। গত কয়েক বছর ধরে তারা এ চেষ্টা করছেন। কিন্তু প্রতি বছরই নাকি তারা কোনো না কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ব্যর্থ হয়ে দেশে ফেরেন- জানালেন ভোলা।

বিকাল ৩টা:
কিছুক্ষণ পর আরেকটা খবর শুনে ফের মন খারাপ হয়ে গেল। একজন শেরপা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবিসিতে। তাকে এবিসি?র অন্যান্য শেরপারা ?রেসকিউ? করে নিয়ে আসছেন বেস ক্যাম্পে। আর বেস ক্যাম্পের শেরপারাও দুপুরের খাবার খেয়ে একেবারে প্রস্তুত মিড ক্যাম্পে গিয়ে সেই উদ্ধার ততপরতায় যোগ দিতে। এদিন এ ঘটনায় শেরপাদের মধ্যে যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা, বিপদে কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করার প্রবণতা দেখেছি, তাতে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। ভাইয়ের বিপদে আরেকজনের দুশ্চিন্তা, উতকণ্ঠা আমারও হৃদয় ছুয়ে গেল। আটজন শেরপা রওয়ানা হলেন মিড ক্যাম্পের দিকে। আর তাদের প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, গরম চা যোগান দিতে এক কিচেন স্টাফ কিছুক্ষণ পর যোগ দিল সেই মিছিলে।

বিকেল পাঁচটার দিকে সেই অসুস্থ শেরপা দীপেন্দ্রকে নিয়ে সবাই বেস ক্যাম্পে পৌঁছতেই আগে থেকে প্রস্তুত জিপে তাকে তুলে দেয়া হলো। তিনি অ্যাপেন্ডিসাইটিস-এ আক্রান্ত হয়েছেন। গাড়ি তাকে আজ রাতের মধ্যেই নেপাল সীমান্তে অপেক্ষারত ৬টাঅ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেবে। সেই অ্যাম্বুলেন্স যতো দ্রুত সম্ভব কাঠমান্ডুর হাসপাতালে দীপেন্দ্রকে হস্তান্তর করবে। তার মানে হলো ইন্সুরেন্স করা থাকলেও এখানে যেকোনো ধরনের অসুস্থতায় এভাবেই পরিবহন সুবিধা নিয়ে প্রায় আট-দশ ঘণ্টা যাত্রার পর হাসপাতালে পৌঁছালে তবেই চিকিতসা সুবিধা পাওয়া যাবে। জীবন এখানে কতো কঠিন!

সন্ধ্যা ৬টা:
সন্ধ্যায় বেশ ঠাণ্ডা। ডায়নিং টেন্টে ঢুকে পড়লাম। সেখানে গ্যাসজ্বালিত হিটার আছে। সেই হিটারে হাত-পা, শরীর গরম রাখতে সব শেরপারা এসে ভিড় করেছে ডায়নিং টেন্টে।

রাতের খাবার শেষে সেখান থেকে বের হতেই দেখলাম চারদিক চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু তখনও পূর্ণিমা নয়। তার দেরি আছে হয়তো আর দুই দিন। কিন্তু বেস ক্যাম্পের চৌহদ্দি তাতেই উদ্ভাসিত। আর এম সিস্টেমসের কল্যাণে পাওয়া ক্যামেরায় সেই রাতের ছবি তুললাম। তবে চাঁদের আলোর মোহনীয় উপস্থাপন তো ক্যামেরাবন্দী করা অসম্ভব। রাত ন?টার দিকে তাঁবুতে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে শরীরটা গলিয়ে দিতেই সঙ্গে সঙ্গে ঘুম।
« Day 18  Day 20 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact