Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 17
এবার একদিনে বেস ক্যাম্প
এপ্রিল ২৪, ২০১০
১৭শ দিন

ভোর ৬টা:
গত রাতে পর্যাপ্ত ঘুম হয়েছে। বলা চলে একটানা ঘুমিয়েছি। মাঝে শুধু একবার পানি খাওয়ার জন্য উঠেছিলাম। তখন এতই ঠাণ্ডা ছিল যে ভাবলাম যে হাতের ঘড়ি তাঁবুর গায়ে রেখে তাপমাত্রা পরিমাপ করা যাক। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। একটু পর তাপমাত্রা পরীক্ষা করে দেখি মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তখন একবার ভেবেছি, এতো ঠাণ্ডায় রাত পার করছি- এটা কোনো স্বপ্নের ভেতর ঘটছে না তো? আর এমন ঠাণ্ডার মধ্যে রাত কাটানো, এমন কখনো হয় নি। কোনো পর্বতারোহণেই মনে হয় এতো ঠাণ্ডা ছিল না।

যাই হোক। সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখনও কিন্তু আগের রাতের চিন্তা রয়ে গেছে মনে। তারপরও একটা নতুন দিন। আর গতরাতের আমার চিন্তার ব্যাপারে তো সোম বাহাদুর আর কৈলাস তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। কাজেই এ নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলছি না। ফলে প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর সোম বাহাদুরের সঙ্গে যে খুনসুটি চলে, আজ তা আর করলাম না। চোখমুখে যেন সিরিয়াস একটা ভঙ্গি ফুটে উঠেছে। তাই ঘুম ভাঙার পর সরাসরি বের হয়ে পড়েছি তাঁবু থেকে।

তাঁবু থেকে বের হয়ে কিচেন টেন্ট থেকে চায়ের মগ হাতে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। যদিও ঠাণ্ডা তখনও তুঙ্গে। উদ্দেশ্য ভোলার সঙ্গে দেখা করা এবং তার কাছে একটু ঘুরিয়ে প্রসঙ্গটা উপস্থাপন করে মূল তথ্য বোঝার চেষ্টা করা। তার সঙ্গে দেখা হতেই কুশলাদি বিনিময়ের পর মূল প্রসঙ্গে যখন চলে গেলাম, তিনিও যখন কৈলাসের কথাগুলোর প্রতিধ্বনি করে গেলেন, তারপর নিশ্চিন্ত মনে সকাল পৌনে ন?টায় বেস ক্যাম্পের দিকে নামা শুরু করেছি। এদিনও প্যাক লাঞ্চ সঙ্গে দিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে সকালে নাশতায় এদিন বেশ টেনে খেয়েছি। হট চকোলেট ড্রিঙ্ক, মধু দিয়ে পরিজ, প্যান কেক, ডিম ইত্যাদি দিয়ে আগের মতোই নাশাত সারলাম।

সকাল ৯টা:
এ কয়দিনে চেহারা পুড়ে গেছে। প্রায় ২২ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ঘুরে এসেছি। এখানে সূর্যের আলো এসে পড়ে একেবারে নির্ভেজাল। সেই সঙ্গে বরফে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে আরেকটা ?গ্লেয়ার? নিচ থেকে শরীরে এসে ঠেকে। ফলে আলোর যুগপত ততপরতায় শরীরের যে অংশটুকু খোলা থাকে, তার চামড়া পুড়ে যায়। ঠোটও এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ফেটেছে। মুখের চামড়া পুড়লে ক্ষতি নেই। কিন্তু ঠোট ফেটে গেলে রক্ষা থাকে না। জ্বালিয়ে মারে। তাই এ থেকে বাঁচতে লিপজেল ব্যবহার করতে হলো। যদিও সঙ্গে সানস্ক্রিন ক্রিম ছিল, তারপরও সেটা ব্যবহার করিনি একদিনও।

একই পথে এদিন হেঁটে দুপুর একটার মধ্যে মিড ক্যাম্পে পৌঁছলাম। এখানে দেখি একজন তিব্বতীয় ছেলে (টিনএজ) মিড ক্যাম্পের স্থাপনা পাহারা দিচ্ছে। সে মিড ক্যাম্পের তাঁবু, কিচেন সরঞ্জাম ইত্যাদি পাহারা দেয় আর কেউ এলে তাকে চা বানিয়ে খাওয়ানো বা কেউ যদি মিড ক্যাম্পে থাকতে চান, তাহলে তাকে সহযোগিতা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে। সোম বাহাদুর জানালেন- তিব্বতীয় এই ছেলেপেলে বা পর্বতের সাধারণ মানুষের জীবন খুবই কঠিন। এদের কোনো সম্মানজনক পরিচয় নেই। তারা বাঁচার জন্য অনেক অসম্মানজনক কাজও করে। আর এখানে কাজের জন্য তারা যে অর্থ পায়- দিনে প্রায় পাঁচশ নেপালি রুপি, তার কিছু ভাগ না কি এখানে দেখভাল করনেঅলা কর্তৃপক্ষের সদস্যদের দিতে হয়। এই কর্তৃপক্ষ কে? এর জবাবে সোম বাহাদুর জানালেন- এ এলাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছে সরকারের যে সংস্থা, তার সদস্যরাই এটা করে। সোম বাহাদুরের মতে- এই স্তরের মানুষের পরিচয়পত্রও নাকি থাকে না। তাই তারা কখনও মূল ভূখন্ডে যেতে পারে না। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।

বিকাল ৩টা:
ভাবছিলাম জীবন এই পর্বতে কতো কঠিন। বিকাল পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম বেস ক্যাম্পে। অর্থাত প্রায় বাইশ কিলোমিটার পথ এর আগে পার হয়েছি দু?দিনে। আর এদিন সেই পথ নেমে গেছি আট ঘণ্টায়। পরে জেনেছি শেরপারা এবিসি থেকে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত এই পথ পাড়ি দেন মাত্র পাঁচ ঘণ্টায়।

মাঝে বেস ক্যাম্পে পৌঁছার আগে যেখানে পর্বতের ঢাল শেষ হয়েছে, সেখানে দেখলাম অনেকগুলো হিমালয়ান থর হেঁটে বেড়াচ্ছে। তারা পর্বতের গায়ে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের দেখে নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল। এ সময় কিছু হিমালয়ান কক-এর দল চোখে পড়ল। একেবারেই পর্বতের ঢাল থেকে যখন নেমে এলাম, এ সময় শুরু হলো গ্লেসিয়ারের বরফ গলা পানির তৈরি লেক বা হ্রদ। এসব লেক হাতের বামে, আর পর্বতের রিজ হাতের ডানে। অবশ্য পুরো এলাকটা যেন এক বিশাল উপত্যকা। সেই উপত্যকার ডান দিকের পর্বতের রিজের পাদদেশ ঘেষে আমরা সবাই ফিরে চলেছি বেস ক্যাম্পে। আর গ্লেসিয়ার রয়েছে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার চওড়া এবং প্রায় চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকা জুড়ে। এর ভেতর কিছু কিছু জায়গায় তৈরি হয়েছে লেক। হঠাত ডান দিকে দেখি রিজের ওপর পাথর যেন ঝুলে আছে। অর্থাত, এখানে পর্বতের গায়ে মাটিময় পাহাড়ে যখন বরফ পড়ে, গরমে সেই বরফ গলে পানি তৈরি হয়ে মাটিকে ভিজিয়ে দেয় অনেক গভীর পর্যন্ত। এরপর আবার হঠাত যখন তাপমাত্রা কমে যায় অনেক বেশি, সে সময়ে এই মাটি-পানি-পরিবেশ মিলে তৈরি হয় 'পার্মাফ্রস্ট'। সেই পার্মাফ্রস্ট হয়ে থাকা পর্বতের রিজের ওপর যে কয়টা জায়গায় পাথর রয়েছে, তার চারদিকের মাটি প্রচণ্ড বাতাসে সরে গেছে। কিন্তু পাথরের নিচের মাটি সরতে পারে নি। ফলে দেখে মনে হচ্ছে পাথরটা মাটির ওপর আকাশমুখো হয়ে ঝুলে আছে। অদ্ভুত! আবার কয়েকটা জায়গায় পাথরকে দেখলাম পথের ওপর হেলে রয়েছে। যেন কেউ ধাক্কা দিলে এখনই পথের ওপর গড়িয়ে নেমে আসবে। দেখে ভয়ই লাগে।

সারাদিন হেঁটে বেস ক্যাম্পে পৌঁছাতে বিকাল প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেল। তখন ঠিক দুপুরও না, আবার সন্ধ্যা হতেও দেরি। কাজেই দুপুরের খাবার খাবো, নাকি সন্ধ্যার খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকবো- এ নিয়ে বেশ দ্বিধায় পড়লাম। এ সময় এগিয়ে এলেন সোম বাহাদুর। তিনি পরামর্শ দিলেন- এখন হালকা কিছু খেতে। কিন্তু হালকা কি খাওয়া যায়? এটা ভাবতে ভাবতেই হঠাত মনে হলো- চিড়া ভাজা খেলে কেমন হয়? সোম বাহাদুরকে জানাতেই তিনি বললেন- হুমম, ভালোই তো হবে বলে মনে হচ্ছে। একটু স্বাদও বদলাবে। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। কুককে ডেকে বলতেই সে লাফ দিয়ে উঠলেন। বললেন- আরে, এটা কোনো বিষয়ই না। এখনই বানিয়ে দিচ্ছি। ঘটনাটা হলো- বেস ক্যাম্পে যে কুক রয়েছে, সে নেপালি হলেও 'ইন্ডিয়ান ফুড' সম্পর্কে তার যথেষ্ঠ জ্ঞান রয়েছে। কারণ তিনি ভারতীয় তীর্থযাত্রী বা ট্রেকিং দলের সঙ্গে বহু অভিযানে গিয়েছেন। ফলে তাদের খাবার-দাবারের সঙ্গে, রুচির সঙ্গে তার বেশ বোঝাপড়া আছে। কাজেই চিড়াভাজা করে দিতে বলতেই মিনিট পনেরর মধ্যে তিনি ডিম, সবজি, টমেটো ইত্যাদি দিয়ে ঝাল ঝাল করে চিড়া ভেজে দিলেন। আমার দেখাদেখি সোম বাহাদুর, একটু পর কুক নিজেও চিড়াভাজা খাওয়া শুরু করলেন। আমি শুকনো মরিচ ভেজে নিয়ে সেই চিড়া ভাজা খেতে লাগলাম।

হাঁটার ধকলে তাঁবুতে বসে চিড়া ভাজ খাচ্ছিলাম গোগ্রাসে। সেই সঙ্গে গলা অবদি পানি পান। তারপরও যেন তৃষ্ণা মেটে না। এখন খেতে সবকিছুই যেন অমৃত লাগছে। শেরপারা আসলে ঠিকই বলেছিলেন। এবিসি থেকে বেস ক্যাম্পে নেমে আসার পর খাওয়ার রুচি অনেক বেড়ে গেছে। তৃপ্তির ঢেকুর তুললাম খেয়ে।

সন্ধ্যা ৬টা:
পানি পান চলছে সমানে। শরীর থেকে যে পরিমাণ পানি নেমে গেছে, তা পূরণ করতে হবে। সেই সঙ্গে চা-পান করছি ক্রমাগত। একটু পর চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো। এ সময়ে রাইদ আর রিমির কথা মনে পড়ছে। তাঁবুর মধ্যে বসে শুয়ে ভাবছি- তারা এখন কি করছে? আমার কথা কি ভাবছে? একটা কষ্টের দলা যেন পাকিয়ে উঠে আসতে চাইছে গলা দিয়ে। কতোদিন হলো তাদের দেখি না। কথাও বলতে পারছি না তাদের সঙ্গে। আবার কবে কথা বলতে পারবো? এখানে আর দিন-রাতের হিসাব নাই। খুব কষ্ট করে মনে রাখতে হয়। আর ডাইরিতে অবশ্য প্রতিদিনকার ঘটনাগুলো লিখে রাখার সময় যেটুকু তারিখগুলো উল্লেখ করছি, সেটাই দিনক্ষণ মনে করার বা কখনো মনে রাখার একমাত্র উপায়। অবশ্য ইলেক্ট্রনিক ঘড়িতেও তারিখ আর দিন দেখায়। কিন্তু কতোদিন হয়েছে বাড়ি থেকে দূরে রয়েছি, এ হিসাব করতে পারছি না। আর কবে বাড়ি ফিরতে পারবো- এ সম্পর্কে কোনো স্থির ভরসা কেউ দিতে পারে না। জিজ্ঞাসা করলেই হেসে বলে- ধীরে বন্ধু, ধীরে। সময় হলে নিজেই দেখতে পারবে।

এসব ভাবনা নিয়ে মন হয়তো বিষন্ন হয়ে পড়েছিল। তা দেখে সোম বাহাদুর বললেন- মুসা, কি ভাবছো? বলি না যে স্ত্রী-পুত্রের কথা মনে হওয়ায় মন খারাপ। বললাম- এই যে নেমে এলাম বেস ক্যাম্পে। আবার কবে এবিসিতে যাবো, কবে নর্থ কোলে যাবো, কবে সামিট পুশ শুরু করবো- এসব নিয়ে চিন্তা করছি। আমার কথা শুনে তিনি বলেন- শোনো মুসা, এসব নিয়ে একেবারেই ভাববে না। এখান থেকে সফল হয়ে তবেই আমরা ফিরব। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি শুধু এটাই চাইছি। তার কথা শুনে বুক থেকে পাথর নেমে যায় যেন।

রাত ৯টা:
রাতে ন'টার দিকে খাবারের ডাক এলো। তাঁবু থেকে বের হতেই ঠাণ্ডায় যেন হাত-পা জমে গেল। দ্রুত ডায়নিং টেন্টে ঢুকে পড়লাম। এ রাতে বেস ক্যাম্পে আমি একা। তাই ডায়নিং টেন্টেও আমি একা। ড্রাগুটিন, জোকো, ব্লেকা, স্ল্যাগি, তাইওয়ানের দুই পর্বতারোহী এবং লাল বাহাদুর জিরেল আগামীকাল এখানে আসবেন। তাই খাবার-দাবার একাই সাবাড় করছি এ রাতে। শুরু হলো ভুট্টার খই ভাজা দিয়ে। এরপর স্যুপ। তারপর ডাল-ভাত-সবজি। সঙ্গে অবশ্য মুরগির রোস্ট করে এনেছে কুক। অসাধারণ! খেয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। ধন্যবাদ জানালাম সবাইকে।

এরপর তাঁবুতে সেই ঠাণ্ডার মধ্যে তাঁবুতে ফেরা। ডায়নিং টেন্ট থেকে আমার তাঁবুতে ফিরতে হয়তো দশ সেকেন্ডও লাগে না। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। হাতের আঙ্গুল ব্যথা করে। তাই তাঁবুতে ঢুকে সবার আগে হাতের সঙ্গে হাত ঘষে গরম করতে হয়। এরপর ঘুমের আয়োজন। স্লিপিং ব্যাগ বের করে এর ভেতর ঢুকতেই মনে হয় যেন কেউ পানি ঢেলে দিয়ে রেখেছে। তাই কিছু কাপড়চোপড় গায়ে চাপিয়ে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢোকার মিনিট বিশেকের মধ্যেই স্লিপিং ব্যাগের ওম ফিরে এলো। এরপর ঘুমিয়ে পড়তে আর সমস্যা হয় না। হঠাত করে যখন রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়, তখন খেয়াল করেছি যে আগের মতো অক্সিজেন সমস্যায় আর সোম বাহাদুর বাতাস খাচ্ছেন না। আমার ক্ষেত্রেও হয়তো তাহলে একই ঘটনা ঘটছে না। সুতরাং এই উচ্চতার সঙ্গে শরীর মানিয়ে নিয়েছে। এটা ভাবতেই মনটা ভালো হয়ে গেল। সবচেয়ে বড় কথা হলো- উচ্চতার সঙ্গে শরীর খাপ খেয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো এখন আর রাতে প্রচন্ড মাথা ব্যথায় ঘুম ভাংছে না।

এই রাতে ঘুমও হলো অসাধারণ। এক ঘুমে রাত পার।
« Day 16  Day 18 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact