Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 16
নর্থ কোলের দিকে প্রথম ক্রেভাস
এপ্রিল ২৩, ২০১০
১৬শ দিন

ভোর ৬টা:
এখন প্রতিদিনই নিয়ম করে ভোরে ঘুম ভাঙ্গে। আর যেহেতু শরীর উচ্চতার সঙ্গে মোটামুটি খাপ খেয়ে গেছে, অল্প অক্সিজেনেই শরীর বেশ টিকে যাচ্ছে, সুতরাং রাতেও আর মাথা ব্যথা হয় না। অর্থাত, শরীরে লোহিত রক্তকণিকা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয়েছে যা অল্প অক্সিজেনময় পরিস্থিতি থেকে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সংগ্রহ করতে পারে।

বিষয়টা হলো- আমরা যারা সমতলে থাকি, তারা না চাইতেই অক্সিজেন পেয়ে যাই। অর্থাত, শরীরের জন্য যেটুকু অক্সিজেন প্রয়োজন, তা পেতে ফুসফুসকে খুব বেশি কাজ করতে হয় না। আর বাতাসে প্রচুর অক্সিজেন থাকায় রক্তেও খুব বেশি লোহিত রক্তকণিকা থাকার প্রয়োজন হয় না। লোহিত রক্তকণিকার অন্যতম কাজ হলো বাতাস থেকে অক্সিজেন রক্তে যুক্ত করে তা শরীরের বিভিন্ন অংশে- বিশেষ করে মস্তিষ্কে পৌঁছানো। কিন্তু এই সমতলের বাসিন্দারা পর্বতারোহণে এলেই সমস্যায় পড়ি। প্রথম ধাক্কায় মনে হয়- বাতাস থেকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন শরীর পাচ্ছে না। কারণটা হলো- একেবারে শুরুতে অল্প অক্সিজেনময় বাতাস থেকে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সংগ্রহ করতে প্রয়োজনীয় লোহিত কণিকা থাকে না। পরে শরীরের চাহিদা মতো তা তৈরি হয়ে যায়। আর প্রয়োজনীয় লোহিত কণিকা তৈরি হয়ে গেলেই শরীর অল্প অক্সিজেনময় এলাকায় কর্মক্ষম হয়ে ওঠে।

সুতরাং আজ বেশ চাঙা বোধ করছি। কিছুক্ষণের মধ্যে সোম বাহাদুরও ঘুম থেকে উঠে পড়লেন। তিনি ওঠার পরই নাশতা সেরে নিলাম। আজকে নর্থ কোলে যেতেই হবে- যতো যাই হোক না কেন। বহু আলসেমি হয়েছে।

সকাল ৯টা:
কৈলাস আর লাকপা ২৩ হাজার ফুট উচ্চতার নর্থ কোলের ক্যাম্প ওয়ান থেকে ঘুরে আসার পর আজ কৈলাস এমন টিটকারি করা শুরু করলেন যে এমন অলস পর্বতারোহী নাকি তিনি জীবনেও দেখেননি। তার ঠাট্টার থেকে বাঁচতে এদিন সকাল ৯টায় সোম বাহাদুর আর আমি রওয়ানা হলাম নর্থ কোলের দিকে। কিন্তু অগ্রগতি খুবই ধীর। তার মধ্যে এদিন প্রথম পায়ে আইসবুট চড়িয়েছি। ফলে শরীর উচ্চতার সঙ্গে, অক্সিজেন স্বল্পতার সঙ্গে খাপ খেলেও হাঁটার গতি আশাব্যাঞ্জক নয়। বুক যেন হাপরের মতো এখনও ওঠানামা করছে। ফলে কয়েক পা এগোনোর পর দাঁড়িয়ে দম নিয়ে নিচ্ছি। এর ফাঁকে অন্য পর্বতারোহীরা এগিয়ে যায়।

তারপরও আগেরবারের চেয়ে ক্র্যাম্পন পয়েন্টে পৌঁছেছি আধ ঘণ্টা আগে। তবে এখানে পৌঁছার আগে এক-ফুটি চওড়া একটা ক্রেভাস পেয়েছি। সেই ক্রেভাস পার হওয়াটাই যেন ঝকমারি হয়ে পড়ল। কারণ- এ কয়েকদিন সূর্য তার মতো আগুন ঢেলেছে পুরো রংবুক গ্লেসিয়ার জুড়ে। ফলে রংবুক গ্লেসিয়ারের ওপরকার সফট-আইস গলে গিয়ে বহু জায়গায় তৈরি হয়েছে ভারগ্লাস। এই ভারগ্লাস শুরু হয়েছে যে জায়গা থেকে, সেখান থেকে ক্র্যাম্পন পয়েন্ট পর্যন্ত পৌঁছতে মিনিট দশেক লেগে যায় অনেক সময়। কারণ এই ক্রেভাস থেকে ক্র্যাম্পন পয়েন্ট কিছুটা ঢালু। আর বরফ কাঁচের মতো হয়ে যাওয়ায় সহজে তা পার হওয়া যায় না। অনেক জায়গায় বুদ্ধিমান শেরপারা ভারগ্লাসে সহজে হাঁটার জন্য পাথরগুড়া দিয়ে রেখেছে। তার ওপর দিয়ে হাঁটা বেশ কষ্টকর- যদি না আইসবুটের সঙ্গে ক্র্যাম্পন লাগানো হয়। রংবুক গ্লেসিয়ারের যে জায়গা থেকে আইসবুটে আর ক্র্যাম্পন না লাগালে সেই গ্লেসিয়ারের ওপর হাঁটা বা গ্লেসিয়ার পার হয়ে জুমার পয়েন্টের দিকে আর এক পা আগানো যায় না, সেটাকেই অভিজ্ঞ পর্বতারোহী ও শেরপারা ক্র্যাম্পন পয়েন্ট হিসাবে নির্ধারণ করে রেখেছেন। গতকালই চেষ্টা করে ক্র্যাম্পন পয়েন্টের চেয়ে বেশি আগাতে পারিনি।

ক্র্যাম্পন পয়েন্টে আইসবুটে ক্র্যাম্পন লাগিয়ে হারনেস, ক্যারাবিনার, জুমার ইত্যাদি পরে নিলাম। আইসবুটে ক্র্যাম্পন লাগিয়ে বরফে হাঁটা সহজ। ফলে আধ ঘণ্টার মধ্যেই জুমার পয়েন্টে গিয়ে হাজির হলাম সোম বাহাদুর আর আমি। যে জায়গাটিতে রংবুক গ্লেসিয়ার শেষ হয়েছে এবং নর্থ কোলের আগে শুরু হয়েছে সিডব্লিউএম (সেন্ট্রাল ওয়াল অব মাউন্টেন), এবং যেখান থেকে পর্বতের গায়ে প্রায় ষোলশ ফুট (প্রায় ৫শ মিটার) টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিং শুরু হয়- সেটাই এভারেস্টের নর্থ ফেসে জুমার পয়েন্ট। মূলত ফিক্স রোপে জুমার লাগিয়ে ক্লাইম্বিং শুরু করতে হয় বলে এ জায়গার নাম রাখা হয়েছে জুমার পয়েন্ট।

বেলা ১২টা:
এখানে পৌঁছে দেখি ঘড়ির কাঁটা ১২টা পেরিয়েছে। এখানে সামান্য কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে পানি পানের পর শুরু হলো সেই বরফের দেয়াল বেয়ে আরোহণ। এবার কিছুটা ক্লাইম্ব করার পরপরই শ্বাস-প্রশ্বাসে ঠিকঠাক অক্সিজেন না পাওয়ায় যেন জিহ্বা বের করে হাপাচ্ছি। আর প্রতিবারই চায়না-তিব্বত মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের (সিটিএমএ) শেরপারা যেন দৌড়ে নেমে যাচ্ছে সেই পর্বতের দেয়াল বেয়ে। তার শক্তিমত্তা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। কারণ উঠতে গিয়ে আমার জিহ্বা বের হয়ে যাচ্ছে। অথচ তারা যেন এখানে ফুটবল খেলছে।

তবে এর মধ্যেই নিজের একটা ছন্দ তৈরি করেছি। পনের থেকে বিশটা ধাপ আরোহণ করি। এরপর অক্সিজেনের অভাবে বুক হাপরের মতো ওঠানামা করলে দাঁড়িয়ে পড়ে জিরিয়ে নেই। একবার একটা বরফের প্রায় নব্বই ডিগ্রি খাড়া দেয়ালও পার হয়ে গেলাম। আরেকটা সুবিধা হলো- যেহেতু সোম বাহাদুর বেশ বয়স্ক, এবং যেহেতু সোম বাহাদুর বহু মানুষের সঙ্গে পর্বতারোহণ করেছেন, কাজেই তিনি একের পর এক পরিচিত মানুষ পেয়ে যাচ্ছেন এই সিডব্লিউএমের খাড়া বরফের দেয়ালে। পেলেই তিনি গল্প জুড়ে দেন। সেই ফাঁকে আমার জিরানোটাও বেশ হয়ে যায়- না চাইতেই।

এভাবে যখন হাজির হলাম প্রথম ক্রেভাসের ওপর পাতানো অ্যালুমিনিয়ামের মইয়ের সামনে, সেখানে প্যাক লাঞ্চ বের করে খাওয়া শুরু করলাম। লুচি, ডাল, ডিম, জুস, বিস্কুট, চকলেট আর গরম পানি দিয়ে দুপুরের খাবার।

এদিন নর্থ কোলের ক্যাম্প ওয়ান পর্যন্ত যাওয়ার কথা থাকলেও বেলা আড়াইটায় প্রথম ক্রেভাসের সামনে গিয়ে ক্লাইম্বিংয়ে ইতি টানা হলো। সোম বাহাদুর এবার নেমে যাওয়ার পক্ষপাতি। কারণ বাকি পথ পার হতে তখনও ন্যূনতম ঘণ্টা দেড়েক তো লাগবেই। তাই সন্ধ্যার আগে আগেই অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্পে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও এখন ক্যাম্প ওয়ানের দিকে ফের আগানো শুরু করলে তা আর হবে না। এমনকি নর্থ কোলে যেতে যেতেই আলো পড়ে আসতে পারে। আর যেহেতু সঙ্গে নর্থ কোলে রাত কাটানোর মতো সরঞ্জাম নেই, কাজেই এখনি নেমে যাওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

বেলা ৩টা:
নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ফিক্স রোপে শুধু ক্যারাবিনার লাগিয়ে শেরপাদের মতো করে নামছি। কিন্তু এতোদিন পর্বতের রক ফেস বা আইস ফেসে নামার জন্য ট্রেনিংয়ে বা পর্বতারোহণে ডিসেন্ডার ব্যবহার করেছি। এদিনও সঙ্গে ডিসেন্ডার ছিল। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম সব শেরপারা ফিক্স রোপে শুধু ক্যারাবিনার লাগিয়ে ক্যারাবিনার আর রোপ একসঙ্গে মুষ্টি করে ধরে এক ধরনের ?লক? তৈরি করে নেমে যাচ্ছেন। আমাকেও এই নতুন কৌশল পারতে হবে- এ চিন্তা করে সেভাবেই নামা শুরু করলাম। একসময় পুরোটাই নেমে এলাম একেবারে জুমার পয়েন্ট পর্যন্ত। নতুন একটা টেকনিক শেখা হলো। এবার ফিরে যাওয়ার পালা।

রংবুক গ্লেসিয়ার পার হয়ে ক্র্যাম্পন পয়েন্টে এসে আইসবুট থেকে ক্র্যাম্পন, শরীর থেকে হারনেস সেট খুলে সেখানে রাখা একটা প্লাস্টিকের ব্যারেলে ক্র্যাম্পন ও হারনেস সেট ঢুকিয়ে রাখলাম। একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যারা অভিযানে এসেছেন, তারা একই ব্যারেল ব্যবহার করছেন। আর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই তাদের পর্বতারোহীদের জন্য একটা সাধারণ ব্যারেল ক্র্যাম্পন পয়েন্টে রেখে দিয়েছে। পর্বতারোহীরা বারবার এবিসি থেকে ক্র্যাম্পন, হারনেস, জুমার, ক্যারাবিনা, ওয়াকিং স্টিক ইত্যাদি বয়ে না এনে এখানেই ?ডিপোজিট? করতেন সবাই।

এরপর এবিসিতে ফিরে গেলাম সন্ধ্যা হওয়ার আগেই। কৈলাস অগ্রগতি জানতে চাইলে সোম বাহাদুর প্রথম ক্রেভাস পর্যন্ত যাওয়ার কথা জানালেন। সেই সঙ্গে এমন মতও দিলেন যে আমি টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিংয়ে একবারে ঠিকঠাক। কোনো টেকনিক আমার ভুল হয় নি। সোম বাহাদুরের কাছে প্রশংসা শুনে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল।

সন্ধ্যা ৬টা:
এরপর রাতে ডাইনিং টেন্টে রাতের খাবারের আগে সবাই মিলে গল্পে মেতে উঠলাম। এ সময় কৈলাস জানালেন এবার আগামীকাল বেস ক্যাম্প নেমে যেতে হবে। তাহলে উচ্চতার সঙ্গে শরীর একেবারেই খাপ খেয়ে যাবে। তখন পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার খাওয়া সম্ভব হবে। যেহেতু এই ২১ হাজার ফুট উচ্চতার এবিসিতে খাওয়া-দাওয়ার রুচি বেশ কয়েক বেলাই ছিল না, তাই বেস ক্যাম্পে নেমে গেলে এ সমস্যা আর হবে না।

কিন্তু অন্যান্য পর্বতারোহীরা কি করবে? তারাও কি নেমে যাবে? না কি তারা নর্থ কোলের ক্যাম্প ওয়ান, ক্যাম্প টু, ক্যাম্প থ্রি হয়ে সামিটের দিকে রওয়ানা দিবে? আমার এই আশঙ্কার ইঙ্গিতটুকু বুঝতে পেরে সোম আর কৈলাস এবার বোঝাতে শুরু করলেন। তারা বললেন- ?যেহেতু এখন পর্যন্ত নর্থ কোলের ক্যাম্প ওয়ান পর্যন্ত শুধু সিটিএমএ?র শেরপারা রোপ ফিক্স করেছে এবং এর পরের দিকে অর্থাত ক্যাম্প টু পর্যন্তই রুট ওপেন করা হয় নি, কাজেই দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আর শুধু তো আমি নই, পুরো এবিসি?র অন্যান্য গ্রুপের সব পর্বতারোহী ও শেরপারাও এই একই নিয়ম মেনে বেস ক্যাম্পে নেমে যাবে। সুতরাং এ নিয়ে কোনো চিন্তা যেন না করি।?

তারপরও দুশ্চিন্তা কমে না। ভাবছি- যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এভারেস্ট অভিযানে এসেছি, তাতে শুধু সফল হলেই চলবে না, এর চেয়েও বেশি কিছু করতে হবে। তাহলেই শুধু দায় মুক্তি হতে পারে।

রাত ৯টা:
সোম বাহাদুরের প্রশংসায় যেই না উতফুল্ল হয়ে উঠেছি, আগামীকাল বেস ক্যাম্পে নেমে যেতে হবে শুনে তার চেয়েও বেশি মন খারাপ হয়ে গেছে। আসলে বিষয়টা হলো- যে পরিমাণ কষ্ট করে বেস ক্যাম্প থেকে মিড ক্যাম্প এবং সেখান থেকে অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্প পর্যন্ত এসেছি, সবচেয়ে বড় কথা আজ নর্থ কোলের পথে সিডব্লিউএমের প্রথম ক্রেভাস পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে এসেছি, তারপর যদি আবার বেস ক্যাম্পে নেমে যেতে হয়, তাহলে ফের একই রকম কষ্ট স্বীকার করতে হবে। আর এ উচ্চতার সঙ্গে এখন পর্যন্ত শরীর বেশ খাপ খেয়ে গেছে। কাজেই আর বেস ক্যাম্পে যাওয়ার দরকারটা কি- এই ছিল মনে মনে আমার যুক্তি।

সোম বাহাদুর হয়তো আমার মনের ভাবটা বুঝতে পেরেছিলেন। বুঝতে পেরে তিনি বললেন- এটাই পর্বতারোহণের, বিশেষ করে এভারেস্ট অভিযানের নিয়ম। আর আমার জন্যই তাদের সব চিন্তাভাবনা। কৃতজ্ঞতায় তাদের প্রতি ফের মনটা ছেয়ে গেল। আর এর মধ্যেই ঘুমের প্রস্তুতি নিয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
« Day 15  Day 17 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact