Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 13
মধ্যম অনুভূতিতে এবিসি'র আরেকটা দিন
এপ্রিল ২০, ২০১০
১৩শ দিন

ভোর ৬টা:
অনেক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আসলে ঢাকায় থাকলে রাতে সব কাজ সেরে বিছানায় যেতে যেতে সাড়ে বারোটা-একটা বেজে যায়। কিন্তু বেস ক্যাম্প বা অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্পে সন্ধ্যার পর ডায়নিং টেন্টে বসে গল্প করা এবং পানি-চা-বিস্কুট-ভুট্টার খই-পাপড় ভাজা-রাতের খাবার ইত্যাদি খাওয়া ছাড়া আর অন্য কোনো কাজ থাকে না। আর যেহেতু আমি একা, তাই হয় সার্বিয়ার পর্বতারোহী ড্রাগুটিন, মন্টেনেগ্রো'র পর্বতারোহী জোকো, ব্লেকা ও স্ল্যাগি'র কর্মকাণ্ড বসে বসে দেখি। নয়তো তাদের শেরপাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খুনসুটি উপভোগ করি। নয়তো লাল বাহাদুর জিরেল, সোম বাহাদুর বা কৈলাসের সঙ্গে সামান্য এক-দুটা বিষয় নিয়ে আলাপ করি। তাদের সঙ্গে যেই বিষয় নিয়েই আলাপ করি না কেন, কিছুক্ষণ পরে সেই প্রসঙ্গ ফুরিয়ে আসে। তখন ফের চুপচাপ বসে থাকা। আর চায়ের কাপে চুমুক। ডাইনিং টেন্টের বাইরে গেলে মিনিটখানেকও লাগে না, ঠান্ডায় দাঁত কপাট লেগে যায়। তাই অবশ্য মান্য নিয়ম হলো- একেবারে প্রয়োজন না হলে টেন্টর বাইরে না যাওয়া। সব কিছু মিলিয়ে রাতের পর্ব শেষ হয়ে যায় সাড়ে আটটা বা সর্বোচ্চ নয়টার মধ্যে। এরপর একে একে সবাই ডায়নিং টেন্ট ছেড়ে নিজের তাঁবুতে চলে যান। আর নিজের তাঁবুতে এলে খুব বেশি হলে আধঘণ্টার মতো বসে এটা-ওটা কাজ করা যায়। কিন্তু সেটাও তাঁবুতে সঙ্গী কেউ একজন থাকলে। কাজেই নয়টা বা সাড়ে নয়টার মধ্যেই যে কেউ ঘুমিয়ে পড়তে বাধ্য এই বেস ক্যাম্প বা অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্পে। ফলে ঢাকার তুলনায় এখানকার ঘুম হিসাব করলে রাত একটা-দুটার দিকেই মোটামুটি এক পশলা ঘুম হয়ে যায়। এরপর পানি খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লে ভোরে সূর্য ওঠার আগে ঘুম ভেঙ্গে যেতে বাধ্য। এই রুটিনেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। গত পরশু অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্পে এসে হাজির হওয়ার পর শরীরের ক্ষয় কিছুটা পুষিয়ে এলো যখন, খেয়াল করেছি ভোর বেলাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিন্তু তখনো এবিসিতে কাকপক্ষীও ওঠে না। ফলে করারও কিছু থাকে না। আর দেশে গ্রামে-গঞ্জে ভোরে ঘুম ভাংলে যেমন হয় সূর্যোদয় ঘটা করে দেখা যায়, নয়তো গ্রামের আনাচে-কানাচে বা ক্ষেতে ঘুরে বেড়ানো যায়, কিংবা শহরে থাকলে পার্কে শরীরচর্চার জন্য যাওয়া যায়। কিন্তু এখানে তাঁবুর বাইরে গেলেই ঠাণ্ডা গিয়ে আক্রমণ করে হাতের আঙ্গুলে, চোখে-মুখে। কাজেই বড় জোর পাঁচ মিনিট বাইরে থাকার অনুমতি মেলে প্রকৃতির কাছ থেকে। আর সূর্য ওঠার আগে, সবচেয়ে বড় কথা সূর্যের আলো আধঘণ্টা ধরে তাঁবুতে এসে না পড়লে তাঁবু থেকে বের হওয়াটা নিতান্ত বোকামি। কারণ ততোক্ষণে ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে ফের তাঁবুতে গিয়ে ঢুকতে হয়। আর ততোক্ষণে স্লিপিং ব্যাগের ওম যায় চলে। আর স্লিপিং ব্যাগ থেকে একবার বের হয়ে আরেকবার ঢোক যে পরিমাণ ঝকমারি, তার চেয়ে এবিসি থেকে ক্র্যাম্পন পয়েন্ট পর্যন্ত ঘুরে আসা বেস সহজ।

এদিন ঘুম ভাঙতেই দেখি সোম বাহাদুর ভোস ভোস করে তখনো ঘুমাচ্ছেন। তাকে দেখে মনে হয় তৃতীয় রাউন্ডের ঘুম শুরু করি। এ সময় ফের ঘুমাতে বেস কসরত করতে হয়। কারণ প্রয়োজনীয় ঘুম তখন শেষ। এবারের ঘুমটা 'অতিরিক্ত'। খুব একটা ঠেকায় না পড়লে তাই ঘুমাই না। এ সময় রাতে তুষারপাতের কারণে তাঁবুর ওপর যে বরফ জমে এবং রাতে আমার আর সোম বাহাদুরের শ্বাসপ্রশ্বাস থেকে যে জ্বলীয় বাষ্প বের হয়ে তাঁবুর গায়ে লেগে বরফ হয়ে যায়, ধীরে ধীরে সূর্যের আলোতে তার গলে যাওয়া দেখি। মাঝে মধ্যে তাঁবুর বাইরের কাপড়ের স্তর ভেদ করে সেই পানি ভেতরের স্তরে চলে আসে। কখনও কখনও আবার তাঁবুর ভেতরের গায়ের বরফ গলে স্লিপিং ব্যাগের ওপর এসে পড়ে।

আরেকটা কারণ খুঁজে পেয়েছি এমন আলস্যের। তাহলো অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্পে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম। তাই যেকোনো কাজ করতে বেশ আলস্য লাগে। ফলে চিন্তাশক্তি দিয়ে শরীরের কোনো অঙ্গকেই কথা শোনানো যায় না যেন। একটা উদাহরণ দেই- তাঁবুর যেদিকে মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছি, তার উল্টোদিকের চেইন খুলে বের হওয়ার নিয়ম। এই যে চেইনটা খুলতে হবে, সেটা চিন্তা করতেই যেন ঘুম এসে পড়ে। তখন শুয়ে শুয়ে ভাবি যে, কৈলাস বা লাকপা কেউ একজন খোঁজ নিতে আসুক। কিংবা যদি কোনো কিচেন বয় নাশতা করার কথা বলতে আসে, বা বেড-টি টা নিয়ে আসে, তাহলে সে মুহুর্তে যদি তাঁবুর চেইনটা খুলে দিয়ে যায়, তাহলে যেন অনেকটা কাজ সহজ হয়ে গেল। এমনকি দাঁত মেজে যে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে, তাতেও যে কিছু শক্তি ব্যয় করতে হবে, সেটাও করতে ইচ্ছা করে না। বাতাসে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকার ফল যেন মুহুর্তেই টের পাওয়া যায় এই এবিসিতে। কিন্তু সবকিছু যখন একেবারে চূড়ান্তরকম অসহ্য ঠেকে, তখন তাঁবু থেকে বের হতেই হয়।

এমন সময় সোম বাহাদুর চোখ মেলেন। এ রাতে প্রচণ্ড বাতাস বয়ে গেছে শো শো করে। তাই তিনি জাগতেই ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করি- সোম জি, আপনি নাকি এভারেস্ট সামিট করে ফিরে এলেন? এবিসি'র অনেকেই আপনার মতো রাতের বাতাসে উড়ে গিয়ে কোনো পরিশ্রম ছাড়াই এভারেস্ট সামিট থেকে ঘুরে এসেছেন। শুনে তিনি হাসেন।

সোম বাহাদুর কিছু দর্শন মেনে চলেন। তবে কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না তার এসব দর্শনে। যেমন- বেস ক্যাম্প, অ্যাডভান্সড বেস ক্যাম্প ইত্যাদি জায়গায়, অর্থাত পর্বতারোহণ অভিযানে গিয়ে দাঁত মাজলে নাকি দাঁত পাতলা হয়ে যায়। তার এসব যুক্তি শুনে ভাবি- হয়তো বা আবারও অক্সিজেন সমস্যা।

তাঁবু থেকে বের হয়ে পর্বতারোহীরা সবাই যায় ডায়নিং টেন্টে, কিন্তু আমি গিয়ে ঢুকি কিচেন টেন্টে। আমার এই স্বাধীনতাটুকু আছে- বাংলাদেশী হিসাবে এবং তাদের সংস্কৃতির কাছের মানুষ হিসাবে। অন্তত: তাদের খাবারদাবার যেহেতু আমি পছন্দ করে খাই, তাই তারা এ স্বাধীনতাটুকু আমার জন্য রেখেছে। এর সদ্ব্যাবহার করেই আমি এদিন গিয়ে ঢুকলাম কিচেন টেন্টে। তখন মাত্র রংবুক গ্লেসিয়ারের একটা বরফের চাঁই থেকে বরফ ভেঙ্গে নিয়ে এসে তা জ্বাল দিয়ে পানি তৈরি করা শুরু হয়েছে। সেই মুহুর্তে কেতলি থেকে ভুস ভুস করে পানির বাষ্প বের হচ্ছে। দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না, ক্যামেরা বের করে এর ছবি তুলে নিলাম।

সকাল ৯টা:
কিচেন টেন্টের মধ্যে পানি পান, চা পান দিয়ে শুরু হলো নাশতা পর্ব। এক পর্যায়ে কিচেনের সবাই বলতে শুরু করলো যে আমার অন্তত ডায়নিং টেন্টে গিয়ে খাবার-দাবার খাওয়া উচিত, নাশতা করা উচিত। কারণ সেখানে পর্বতারোহীদের জন্য ভালো ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাদেরকে আমি বলি যে, তাইওয়ানিজদের সঙ্গে তো কোনো ধরনের বাতচিত করা যায় না ভাষা-দূরত্ব থাকার কারণে। আর সার্বিয়ান ও মন্টেনেগ্রিন পর্বতারোহীরা যে টুকটাক ইংরেজি জানে, তাতে এই সকালবেলা তারা 'গুড মর্নিং'য়েই সীমাবদ্ধ থাকবে- এতে কোনো সন্দেহ নাই। সুতরাং ডায়নিং টেন্টে গিয়ে যে তাদের সঙ্গে শুধু নাশতাই করবো, তা তো নয়, তাদের সঙ্গে কিছু কথাবার্তাও হওয়া দরকার। তা যখন হবে না, তখন কিচেন টেন্টে বসে তোমাদের সঙ্গে নাশতাও করতে পারবো, টুকটাক কথাবার্তাও চালানো যাবে। শুনে কুক আর বাকি শেরপারা হাসে।

এবার কুক পরিজ, প্যানকেক, ডিম ভাজা ইত্যাদি এগিয়ে দিলেন। এসব খেতেও যেন আলসেমি লাগছে। গলা দিয়ে খাবার নামতে চাইছে না। বহু কষ্টে যেন খাবার খাচ্ছি। অক্সিজেন সমস্যা, এছাড়া আর কিছু নয়।

নাশতা সেরে দেখি কৈলাস আর লাকপা নর্থ কোলে ক্যাম্প ওয়ানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তারা সেখানে ক্যাম্প স্টাব্লিশ করবেন - তাঁবু গেড়ে সেখানে প্রয়োজনীয় খাবার আর অক্সিজেন রেখে আসার মাধ্যমে। তারা আজকের রাতটা সেখানে কাটাবেন। আগামীকাল সকালে আবার ফিরে আসবেন এবিসিতে। যাওয়ার সময় বলে গেলেন- আমি যেন একটু পরে বের হয়ে নর্থ কোলের দিকে যতোটুকু পারি, হেঁটে আসি। আর পারলে নর্থ কোল পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে আসি। তাদের কথায় সম্মতি জানিয়ে আমি টেন্টের ভিতরে গিয়ে ঢুকলাম। কেমন যেন আলসি লাগছে। তাই শুয়ে বিশ্রাম নিতে লাগলাম। এ সময় তাঁবুর চেইন খুলে দিয়ে এবিসিতে লোকজনের আসাযাওয়া দেখছি। আজ খেয়াল করে দেখি- রংবুক গ্লেসিয়ারের পাশে যে পর্বতের রিজটা রয়েছে, সেটাই আসলে এভারেস্টের দিকে ধাবমান। অর্থাত, এই রিজটাই ক্রমান্বয়ে এভারেস্ট চূড়ার দিকে চলে গেছে। কিন্তু এই রিজের পাদদেশে এবং রংবুক গ্লেসিয়ারের যে জায়গা পর্যন্ত পৌঁছে হারনেস সেট পরে পায়ে আইসবুট গলাতে হয়, আইসবুটে ক্র্যাম্পন লাগাতে হয়, সেখান থেকে বেশ খানিকটা গ্লেসিয়ারের ওপর দিয়ে দক্ষিণমুখে গেলে তখন এই পর্বতের দেয়াল একেবারে নাক বরাবর চলে আসে। এটাই নর্থ কোলের সেন্ট্রাল ওয়াল অব মাউন্টেন বা সিডব্লিউএম। কিন্তু এবিসি থেকে ক্র্যাম্পন পয়েন্ট পর্যন্ত পথটুকু ডায়নামিক মোরেন। আর এবিসিটা অনেকখানি বিস্তীর্ণ এলাকায়- ডায়নামিক মোরেনের ওপর গড়ে উঠেছে। এর গা ঘেষে চলে যাওয়া পর্বতের দেয়ালের পাশেই উঁচু ডায়নামিক মোরেনের ওপর বেশিরভাগ তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই উঁচু জায়গা আর রংবুক গ্লেসিয়ারের বরফ শুরু হয়েছে যে অংশ থেকে, তার মাঝটুকু বেশ গভীর। হলেও তা বরফের একেবারে কাছাকাছি। কিন্তু খাবার পানির জন্য বরফ এখানে হাতের নাগালেই। কিন্তু ওই উঁচু ডায়নামিক মোরেনের ওপর যারা তাঁবু ফেলেছে, তাদেরকে আবার পানির জন্য আমাদের তাঁবু এলাকার পাশেই বা কাছাকাছি যেতে হয়। এদিক থেকে আমরা ভাগ্যবান। কিন্তু নর্থ কোলে যাওয়ার জন্য যখন এই গভীর অংশ পার হয়ে সেই উঁচু ডায়নামিক মোরেনের ওপর হাজির হতে হয়, তখন ঢাল বেয়ে ওঠার সময় বারবারই মনে হতো যে এই ঢাল পার হওয়ার চেয়ে তাঁবু ডায়নামিক মোরেনের ওপরই করা ভালো হতো। তাতে শারীরিক কষ্ট একটু কমতো।

এসব ভাবছি, এ সময় দেখি যে আমাদের তাঁবু যে এলাকায়, তার ভাটিতে সেভেন সামিট গ্রুপের শেরপারা আরও তাঁবু ফেলার জায়গা তৈরি করছে। তারা ডায়নামিক মোরেনের ঢালের পাথর সরিয়ে সমতল পট তৈরি করছে। তৈরি হয়ে গেলে এক-দুইটা তাঁবু এনে তা পরীক্ষা করে দেখছেন যে তা ঠিক আছে কি না। অর্থাত, এবিসিতে আরও পর্বতারোহীরা আসছে।

দুপুর ১২টা:
এমন সময় থলের ভেতর থেকে বেড়াল বের করলেন সোম বাহাদুর। তিনি ১৯৫৩ সালের ২৯ মে প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী জোড়ের অন্যতম তেনজিং নোরগে'র আত্মজীবনী 'ম্যান অব এভারেস্ট: অটোবায়োগ্রাফি অব তেনজিং নোরগে' বইটি বের করে এর ইতিহাস বলা শুরু করলেন। তিনি বললেন- প্রায় বছর দশেক আগে এক পর্বতারোহী পোখারার একটা হোটেলে এই বইটা ফেলে গিয়েছিল। তিনি সেটা মালিকবিহীন অবস্থায় উদ্ধার করে নিজের হেফাজতে রেখেছেন। সেটাই বের করে এনে যখন সামনে ধরলেন, সে সময়ে সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসাবে হাজির হলো এই বই। শুরু হলো একটা নতুন অধ্যায়, নতুন জগতকে চেনা। তেনজিং নোরগেকে চিনতে শুরু করলাম। এতোদিন তার কথা টুকটাক বইয়ে পড়েছি বা ইন্টারনেট থেকে জেনেছি। আর ভারতের দার্জিলিংয়ে তার গড়ে তোলা হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে বেসিক ও অ্যাডভান্সড প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় ইনস্টিটিউটের ভেতরে তার জাদুঘর, তার সমাধিপ্রাঙ্গণ ইত্যাদি ঘুরে দেখা এবং তার ছেলে জামলিং তেনজিং নোরগের সঙ্গে আলাপে তার সম্পর্কে যতোটুকু জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু বই পড়ে তেনজিংকে আরও স্পষ্ট জানা শুরু হলো। এমনিক এ অঞ্চলে পর্বতারোহণের ইতিহাসকেও তিনি অনুপুঙ্ক্ষ তুলে ধরেছেন তার বইয়ে। সেই সঙ্গে খুম্বু হিমালয়ের একেবারে কাছের মানুষ হয়েও কিভাবে তিনি দার্জিলিংয়ে তার ঠিকুজি গড়ে তুললেন, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে পারলাম।

বিকাল ৩টা:
কৈলাস আর লাকপা আমাকে এবিসি'র আরাম ছেড়ে নর্থ কোলের সেন্ট্রাল ওয়াল অব মাউন্টেন পর্যন্ত ঘুরে আসার অনুরোধ জানিয়ে গেলেও দুপুরে খাওয়াদাওয়া করার পর আলস্যে ঘুমিয়ে পড়লাম। এরপর উঠে ফের ডুবে গেলাম বইয়ে। এরপর একসময় বেলা যখন পড়ে এলো, এবিসির পাশের পর্বতের দেয়ালের ওপারে চলে গেল সূর্য এবং এবিসি'র ঠাণ্ডার পরিমাণ বেড়ে গেল বহুগুণ, তখন গায়ে ডাউন জ্যাকেট আর অতিরিক্ত ট্রাউজার চাপিয়ে চললাম কিচেন টেন্টে। সন্ধ্যার ঠিক আগ দিয়ে গিয়ে সেখানে রেডিওতে কৈলাস আর লাকপার সঙ্গে আলাপ হলো। তারা সফলভাবে নর্থ কোলে ক্যাম্প ওয়ান স্টাব্লিশ করেছেন। তারা আমাদের অগ্রগতি জানতে চাইলে হেসে পরিস্থিতি জানালাম। তারা আগামীকাল নাশতা করেই কাজে নেমে পড়ার তাগিদ দিলেন। এ সময় তাদের আশ্বস্ত করলাম।

সন্ধ্যা ৬টা:
বহুদিন হয়ে গেল দেশের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। রিমি আর রাইদ কেমন আছে- তা জানি না। যোগাযোগ করার কোনো উপায় নেই। আর ভোলা পাউডেলের সঙ্গে স্যাটেলাইট ফোন নিয়ে যা হয়েছে, তাতে আরেকবার তার কাছে গিয়ে ফোনের জন্য আবদার করাটা ঠিক মন থেকে সায় দিচ্ছে না। কিন্তু যেই রাইদ মাত্র মাস তিনেক আগে 'বাবা' ডাক শিখেছে, তার কথা মনে হলে বিষন্নতা ভর করে। তখন চুপচাপ একখানে বসে থাকি। কাপে চা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। অনেক সময় কারো আওয়াজে যেন কেঁপে উঠি। আমার এ অবস্থা দেখে শেরপারা সবাই হাসেন। বলেন- মুসা চিন্তা কোরো না, এভারেস্ট জয় নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। লাকপা আর কৈলাস খুবই শক্তিশালী শেরপা। তারা ঠিকই তোমাকে এভারেস্টজয়ী হতে সহায়তা করবে। আর সবকিছু ঠিক থাকলে জয়ী তুমি হবেই। মনে মনে ভাবি- এখন চিন্তা এভারেস্ট নিয়ে নয়, মন পড়ে আছে প্রিয়জনের কাছে।

একটু পর ভেজিটেবল স্যুপ বা রসুনের স্যুপ চলে আসে। এই স্যুপ উচ্চতার সঙ্গে শরীরের খাপ খাওয়ানোর জন্য বেশ কার্যকর। অর্থাত রসুনের স্যুপ শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ায়। উচ্চতাজনিত কারণে হাই অলটিচুড সেরিব্রাল এডিমা (High Altitude Cerebral Oedema) হলে মস্তিষ্কে ফ্লুইড জমে। তখন প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করে। এছাড়াও মাথা ব্যথার সঙ্গে শুরু হয় বমি বমি ভাব, খাওয়ার রুচি কমে যায়, ঘুম ঠিক মতো হয় না। আবার হাই অলটিচুড পালমোনারি এডিমা (High Altitude Palmonary Oedema) হলে ফুসফুসে পানি বা ফ্লুইড জমে। তখনও পর্বতারোহী বা শেরপাদের শরীরে একই ধরনের বিপত্তি দেখা যায়। এ ধরনের সমস্যায় একমাত্র সমাধান হলো বেশি করে তরল পান। তবে ঔষধও অনেক সময় আরোগ্য এনে দেয়। তবে খুব বেশি সমস্যা হলে যে উচ্চতায় এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তার চেয়ে নিচে নেমে যাওয়াই একমাত্র উপায়। তাই উচ্চতাজনিত সমস্যা থেকে বাঁচতে ড্রাগুটিন, জোকো, ব্লেকা ও স্ল্যাগিকে কাঁচা রসুন খেতে দেখছি।

এর পরপরই ভুট্টার খই বা পাপড় ভাজা চলে আসে। ফলে এসব বিস্বাদ স্যুপ খেতে একটা সহায়ক খাবার পাওয়া যায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাতের খাবার চলে আসে। এসব খেয়ে আজ তাঁবুতে ফিরে ঘুমাতে অবশ্য বেশ কসরতই করতে হলো। কারণ আজ শরীর পুরো বিশ্রাম পেয়েছে। আর সারাদিন কেটেছে বেশ আরামে। ফলে ঘুমানোটা হলো অনেকটা ঝকমারি।

রাত ৯টা:
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম ঠিকই। কিন্তু নিয়ম মেনে রাত প্রায় দেড়টায় মাথার ঠিক পেছন থেকে কপাল পর্যন্ত একটা সরলরেখা বরাবর তীব্র ব্যথা শুরু হলো। ব্যথায় উঠে বসতে হলো। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর ব্যথা যেন কিছুটা কমে এলো। তারপরও বাড়তি সতর্কতা হিসাবে প্যারাসিটামলের অর্ধেকটা খেয়ে দিলাম ঘুম।
« Day 12  Day 14 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact