Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 1
বিশাল যুদ্ধ শেষে কাঠমান্ডু যাত্রা
এপ্রিল ০৮, ২০১০
ভোর সাড়ে ৫টা:
ঘুম ভেঙে গেল। মূলত দুশ্চিন্তায়। কারণ আর কয়েক ঘণ্টা পর রওয়ানা দিব এভারেস্ট অভিযানে। স্বপ্নের এভারেস্ট অভিযান। কোথায় শিহরিত থাকবো তা না, উল্টো দুশ্চিন্তা এসে ঘুমের মধ্যে হানা দিয়েছে বারবার। যাবো, এটুকু নিশ্চিত। কিন্তু কিভাবে যাবো, তা এদিন সকাল পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। কারণ তা স্পষ্ট করা সম্ভব হয় নি। বহু রথী-মহারথী উল্টো-ঘুর দিয়েছেন। বেশিরভাগ পরিচিত মানুষ, বন্ধু-শত্রু, শুভাকাঙ্ক্ষী-হিতার্থী চেয়েছিলেন যেন এদিন এভারেস্ট অভিযানে না যাই। কিন্তু তাদের কথা শুনলে আমার চলবে কেন? শুনিনি। পণ করেছিলাম যে শুনবো না। যাবোই, যেতেই হবে এভারেস্ট অভিযানে। ইস্পাতদৃঢ় জিদ, প্রতিজ্ঞা, আকাঙ্ক্ষা তাড়িয়ে নিচ্ছে সারাক্ষণ। হলেও মনকে সুস্থির করা যাচ্ছে না।

বেলা ১টায় বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট। তার মানে বেলা ১১টার মধ্যে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে বিমানবন্দরে। কিন্তু সকাল সাড়ে দশটায় নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশ - এনএসিবি'র কার্যালয়ে আমার এভারেস্ট অভিযান উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে। অর্থাৎ এই সংবাদ সম্মেলন ১১টার মধ্যে শেষ করে রিমিদের বাসা থেকে ব্যাগ নিয়েই দৌড় দিতে হবে। এক মুহূর্তের ফুরসত নাই। তার আগে সবচেয়ে বড় যে কাজটা করতে হবে তা হলো- মনির (বড় বোন) ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে তা নেপালে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য তুষারকে সকাল দশটার মধ্যেই ব্যাংকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করেছি। এর অর্থ হলো সবকিছু একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে ঘটলে এবং সবকিছু পরিকল্পনামাফিক ঘটলে তবেই শুধু এদিন যাত্রা করা সম্ভব।

সংবাদ সম্মেলন করার জন্য গতকাল সবগুলো সংবাদ মাধ্যমে ফ্যাক্সবার্তা পাঠানো হয়েছে। পত্রিকায় দেখেছি যে বিএমটিসির এভারেস্ট অভিযান উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অভিযাত্রী এম এ মুহিতের হাতে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেয়া হয়েছে বেশ ঘটা করে। অথচ আমার এভারেস্ট অভিযানের সংবাদ সম্মেলনে অভিভাবকত্ব করার জন্য কাউকে পাই নি। কাজেই অনেকটা দীনহীন অবস্থাতেই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। চিন্তার আরো কারণ হলো এনএসিবি কার্যালয় তো সংবাদমাধ্যমের কেউ তেমন চেনেন না। কাজেই সবাই আসবেন কি করে? আর অভিযানে যাওয়ার পুরো টাকাই এখনো হাতে নেই। এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করতেও তো টাকার খরচ। সেই খরচ কে দেবে? কিন্তু এনএসিবি'র কোষাধ্যক্ষ মুস্তাফিজুর রহমান টিটুর মত ছিল যে এভারেস্ট অভিযানে যেহেতু সবাই সবসময় যাবে না, যায় না, তাই এর জন্য সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা বাধ্যতামূলক হিসাবেই গ্রহণ করা উচিত। তার চাপাচাপিতে মনের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করছি এদিন। সকাল সাড়ে ৫টায় ঘুম ভাঙার পর তাই এটা নিয়েও এক ধরনের দুশ্চিন্তা ভর করছে মনে।

ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই রিমি'র মন ভার (আর আমি দুশ্চিন্তায়)। ঠিক মতো কথা বলছে না। খুব প্রয়োজন না হলে সে কাছেও ভিড়ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো রাইদও ঘুম থেকে উঠে গেল। মাত্র কয়েকদিন আগেই সে 'বাবা' ডাক শিখেছে। এখন ছোট ছোট বাক্যে তার ইচ্ছাগুলো জানায়। সেই রিমি-রাইদকে ফেলে যেতে হবে। বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। উঠলেও একটু পরই স্বার্থপরের মতো তাদেরকে ফেলে যাবো। আমার কিছু হলে তাদের কি হবে- এমন কোনোকিছুর ব্যবস্থা না করেই যাচ্ছি। মনে একটা পাপবোধ কাজ করছে ঠিকই। কিন্তু আমাকে যেতেই হবে সেই স্বপ্নপানে। আমার হাত-পা যেন বাধা নিয়তির কাছে।

ক্লাবের একজনের পেছনে গত কয়েকদিন অনেক ঘুরলাম। কিন্তু তার মন গলাতে পারিনি। বহুভাবে তাকে অনুরোধ করে বলেছি যে তিনি একটু চেষ্টা করলেই আমার এভারেস্টযাত্রা হয়তো অনেকটা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু তিনি এটা-ওটা বলে এড়িয়ে যান। অফিসের কর্মব্যস্ততাও তার আরেকটা অজুহাত। সব মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে যে বোন মনির ব্যাংক অ্যাকাউন্টই সই।

সকাল ৯টা:
সেই অনুযায়ী সকালে নাশতা আর গোসল সেরে সাড়ে নয়টার দিকেই ব্যাংকের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না। একটু থামতে হলো রিমির জন্য। সে জিজ্ঞাস করে বসল- তোমার সঙ্গে যে কথা বলছি না, এটা কেনো তা জানো? আমি তখন মুহূর্তের মধ্যে এভারেস্ট থেকে বাস্তবতায় ফিরলাম। কোনো কথা বের হলো না। শুধু বললাম- স্যরি। আমাকে ক্ষমা কোরো। তার দু-চোখ বেয়ে টপটপ অশ্রু ঝরছে।

রিমি আবার বলে- তুমি যে আমার সঙ্গে বসে দু'দন্ড কথাও বললে না! তার কণ্ঠে অভিমান। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি নির্বাক। তাকে বুকে টেনে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে যেন ছোট শিশুর অভিমান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করছি। শুধুই বললাম- যাই? শুনে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো। এবার আর সহ্য করা গেল না। এক ছুটে বের হয়ে গেলাম গ্রিন রোডের তাদের বাসা থেকে। ততোক্ষণে রাইদ ফের ঘুমিয়ে পড়েছে।

গন্তব্য কারওয়ানবাজার। মোটর সাইকেলে দশটা বাজার কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছে দেখি তুষার হাজির। রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে আলাপ করতে করতেই হঠাত উপস্থিত হলেন পল্লব মোহাইমেন- প্রথম আলোর উপ-ফিচার সম্পাদক। এসে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন- আমি তো তোমার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আসলে হয়েছে কি জানো?

এ পর্যায়ে আমি তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিলাম। বললাম- থাক, আর জানাতে হবে না। আপনারা আমার জন্য বহু করেছেন। এজন্য আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। এই এভারেস্ট অভিযানটা আমাকে একাই করতে হবে। এটা শুধু আগে একটু বলতেন।

আমার গলায় উষ্মা। শেষে তাকে একটা শুকনো হাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে গেলাম। ব্যাংক থেকে জানালো যে আমি যে পরিমাণ টাকা তুলতে চাই, তার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া নেই। তবে এটা করে তবেই টাকা তুলতে পারবো। সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে টাকা নিয়ে প্রথমে মনিকে একটা এসএমএস পাঠালাম- মনি, কোনো উপায় না পেয়ে তোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টকেই একমাত্র ভরসা ভেবে টাকা নিয়ে এভারেস্ট অভিযানে যাচ্ছি।

এর মধ্যেই এনএসিবি অফিসে কয়েকজন রিপোর্টার এসে হাজির। তারা একের পর এক ফোন দিয়ে আমাকে অস্থির করে ফেলেছেন। আমি জিকরুল আহসান শাওনকে দ্রুত ক্লাব অফিসে হাজির হতে বললাম। এর মধ্যে ক্লাবে ব্যানার দিয়ে পাঠালাম। এমন সময় পান্থপথ আর গ্রিন রোডে রাজ্যের জ্যাম লেগে রয়েছে। সবাই যেন বুঝতে পেরেছে যে আমার তাড়া আছে। তাই রাস্তায় জ্যাম লাগিয়ে বসে রয়েছে।

১০টা ৪৫ মিনিট:
ক্লাব অফিসে হাজির হলাম। দেখি যে এবিসি রেডিও, দি ডেইলি স্টার আর আরটিভি থেকে শুধু সাংবাদিকরা এসে হাজির। আর কোনো সংবাদ মাধ্যম থেকে কেউ এলেন না। ক্লাবের সদস্য জুয়েল, সাইফুল, তৃষা, এক্সট্রিম বাংলার সভাপতি কাজী হামিদুল হক, এভারেস্টযাত্রার সঙ্গী নিয়াজ পাটোয়ারি, ওমর, টিটু, রাজিব, রাফা, টুটুল ছিলেন বলে রক্ষা। রিমিও এসেছে ক্লাবে।

এর মধ্যে বিদ্যুত নেই। ফলে একটা ভ্যাপসা গরম। সেই গরমের মধ্যেই শাওন আর মামুন ব্যানার ধরে দাঁড়ালেন। শুরু হয়ে গেল সংবাদ সম্মেলন। কাজী হামিদুল হক কিছু কথা বললেন। এরপর আমার বলার পালা। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে এভারেস্ট অভিযানের পূর্বাপর কিছু কথা বললাম। সবশেষে সবার কাছে দোয়া চেয়ে শেষ করলাম সংবাদ সম্মেলন। সব মিলিয়ে হয়তো ২০ মিনিট সময় লাগলো। এর মধ্যেই শাওন আর মামুন ঘেমে একাকার। তাদেরকে জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতা জানালাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে তুষার এসে হাজির। তার গাড়িতে আমাদের বিমানবন্দরে যাওয়ার ব্যবস্থা। সবার কাছে বিদায় নিয়ে ক্লাব থেকে বের হতে হতেই প্রায় ১১টা বেজে গেল। তখন পড়িমড়ি করে মোটরসাইকেলে রিমিকে নিয়ে তাদের বাসায় হাজির হয়েছি। দেখি রাইদ ঘুম থেকে উঠে পড়েছে।

সে দেখছে যে তার বাবা বিশাল দুটো ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছে। তাকেও বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। কাপড়চোপড় পড়ানো হচ্ছে। কাজেই সে খুশি।

প্রায় মাস দু'য়েকের জন্য রাইদ আর রিমিকে ছেড়ে অজানা এক গন্তব্যে রওয়ানা দিব আর কিছুক্ষণ পর। কিন্তু রিমিকে বা ছেলেকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয় নি। ৮ এপ্রিল রওয়ানা দেওয়ার জন্য সবকিছু আয়োজন করতে গিয়ে তার পাশে বসে আর মন খুলে দু?টো কথা বলা হয় নি। এ নিয়েও মনে মনে নিজেকে গালমন্দ করি। কিন্তু ততোক্ষণে যে একটা ঘোরটোপে বাধা পড়ে গেছি। এ নিয়ে শ্বাশুড়ি রিমিকে বোঝান। রিমিও বোঝে আর কষ্ট বুকে চেপে ছায়ার মতো আমার সঙ্গী হয়ে থাকে। রাইদ তখনো জানে না তার বাবা চলেছে কোন গন্তব্যে।

এর মধ্যে আব্বা আর আম্মা ফোন দিলেন। তারা জেনে গেছেন যে এদিন আমি যাচ্ছি এভারেস্ট অভিযানে। আম্মা বারবারই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কিন্তু তাকে আশ্বস্ত করতে পারি না যে কোনো বিপদের মুখে নিজেকে আমি ঠেলে দিচ্ছি না। পর্বতারোহণে কোনোরকম বিপদের সম্ভাবনা দেখলেই নিজেকে নিরাপদে সরিয়ে নিব- এ কথাটা তাকে বিশ্বাস করাতে পারছি না। একসময় হাল ছেড়ে দিলাম। বললাম, নিজের জন্য হলেও আমি নিজেকে নিরাপদ রাখবো। আব্বা বললেন, যাচ্ছো, যাও। সবসময় আল্লাহকে স্মরণ কোরো।

বাসায় শ্বাশুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রিমি-রাইদকে সঙ্গী করে তুষারের গাড়িতে বেলা প্রায় পৌনে বারটার হাজির হলাম এয়ারপোর্টে। দেড় বছর বয়সী রাইদ তখন খুশি যে বাবা তাকে কোনো একটা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটু পরই যে বাবা তাকে নিষ্ঠুর হয়ে বিদায় জানাবে, এটা তাকে বোঝাবে কে?

বেলা ১২টা:
এয়ারপোর্টে বিদায়ের ক্ষণ এসে গেল। কষ্টে গলা বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করি না। সবাইকে হাসিমুখে বিদায় জানাই। রিমিকে বুকে টেনে নিয়ে বলি, ভালো থেকো। উত্তরে সে শুন্য দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকায়। দ্রুতই তার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেই। যাতে আমার কষ্টে সে ভেঙে না পড়ে। রাইদকে কোলে নিয়ে আদর করে তার হাতে একটা ট্রলি ধরিয়ে দেই গাড়ির মতো চালানোর জন্য। সে খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে ঢুকে পড়ি এয়ারপোর্টের ভেতর। যে রাইদের গাড়ি পছন্দ, তাকে নিয়ে গাড়িতে করে বাসায় ফেরাটা বেশ ঝকমারি হয়ে পড়েছিল- পরে মুঠোফোনে রিমি জানাল। একবার মুঠোফোন ধরিয়ে দিয়ে বলল, রাইদকে কথা বলে একটু শান্ত করো। তার বাবা তাকে ছেড়ে চলে গেছে, এটা সে মানতে পারছে না। গাড়ি তখন তার কাছে প্রধান নয়, বাবাকে কাছে চাই। তাকে বললাম- আব্বু, তুমি মমের কাছে থাকো। আমি চলে আসবো। তার কান্না তখন থামানো দায়। কাঁদছে আর বলছে- বাবা, তুমি আসো। আর এদিকে এয়ারপোর্টে আমি চোখের কোণে কান্না লুকাতে ব্যস্ত।

আমাদের বিশাল ব্যাগ দেখে বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমানের কর্মী ফেরদৌস জিজ্ঞেস করলেন- ভাই কোথায় যাচ্ছেন এত বড় ব্যাগ নিয়ে? তার কথায় উত্তর কিভাবে দেয়া যায় চিন্তা করছিলাম। ভাবলাম বলি- প্লেন যাচ্ছে নেপালে, সুতরাং অন্য কোথাও তো যাওয়ার উপায় নেই। এ সময় উদ্ধার করলেন নিয়াজ। তিনি বললেন- আমরা নেপালে এভারেস্ট আরোহণ করতে যাচ্ছি, তাই সঙ্গে অনেক জিনিসপত্র এবং স্বাভাবিকভাবেই ব্যাগটা অনেক বড়। এবার জনাব ফেরদৌস এক মুখ হাসি দিয়ে বললেন- ভাই এভারেস্ট চূড়ায় যখন উঠবেন, তখন যদি এই অধমের কথা স্মরণ করেন, তাহলে খুশি হবো। এবার তার সরলতায় মন ভরে গেল। বললাম- ঠিক আছে, দোয়া করবেন যেন এভারেস্ট চূড়ায় উঠতে পারি। ফেরদৌস এবার জড়িয়ে ধরে বললেন- অবশ্যই দোয়া করছি। আপনি সফল হবেন।

যাত্রার সময় সঙ্গে এভাবেই রইল অসংখ্য মানুষের শুভকামনা। মুঠোফোনে শুভেচ্ছা জানালেন আনিসুল হক, সুমনা শারমিন, পল্লব মোহাইমেন, ফখরুল আবেদিন মিলন এবং আরও অনেকে। সুমনা শারমিন বললেন, যে কাজে যাচ্ছিস, সেটা করে তবেই ফিরবি।

আমরাই মনে হয় সর্বশেষ যাত্রী ছিলাম বিমানের। উড়োজাহাজে উঠতেই হ্যাচ টেনে বন্ধ করা হলো দরজা। নির্দিষ্ট আসনে বসে পড়লাম। এদিন সঙ্গী হলেন এনএসিবি?র নতুন সদস্য নিয়াজ পাটোয়ারি। তিনি নেপাল দিয়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকিং করতে সঙ্গে চললেন। প্লেনে বসে অস্থির সময় যেন কাটে না। নিয়াজকে স্বগোতক্তির মতো বলছি- আচ্ছা, আপনার কাছে মনে হচ্ছে না যে প্লেন একটু ধীরে চলছে? নেপালে পৌঁছাতে এতো দেরি হচ্ছে কেন বলতে পারেন? আসলে তখন আমাকে এক ধরনের অস্থিরতা পেয়ে বসেছে। তাই এমন অকর্মা হয়ে বসে থাকতে ভালো লাগেছে না। তাই নিয়াজকে এমন অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিলাম।

বিকাল ৩টা:
বিকাল তিনটার সময় প্লেন নামিয়ে দিল কাঠমান্ডুতে। ভাবছিলাম, কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় এলাম? মনে এক ধরনের শুন্যতা। দিনটা কিভাবে যে শুরু হয়েছিল, আর দিন শেষে প্রায় কোথায় এসে পৌঁছলাম? আর যে উদ্দেশ্যে এসেছি, তা সফলভাবে শেষ করে ফিরতে পারবো তো?

নেপালের কাঠমাণ্ডুর ত্রিভূবন এয়ারপোর্টে নিয়াজের এক বন্ধু এসে হাজির আমাদের রিসিভ করার জন্য। তিনি নিয়াজের সঙ্গে আমেরিকায় লেখাপড়া করেছেন। এখন কাঠমাণ্ডুতে স্থায়ী। তার গাড়িতে করে চলে গেলাম থামেলে, সোজা কোমল অরিয়ালের অফিস মুক্তিনাথ ট্রাভেলসে।

থামেলে কোমলের অফিসে পৌঁছে দেখি সোম বাহাদুর রাস্তার ওপর সিঁড়িতে বসে আছেন। আমাকে দেখেই হই হই করে উঠলেন। কোমল এগিয়ে এসে অভিবাদন জানালেন। কৈলাস কেমন আছে, লাকপা কোথায়, যে প্রতিষ্ঠান আমার এভারেস্ট আয়োজন করছে, তার লোকজন কোথায়, সে প্রতিষ্ঠানের অফিসটা কোন দিকে, আজকের দিনের কাজকর্ম কি- ইত্যাদি সব প্রশ্নে কোমল অস্থির হয়ে গেলেন। বললেন- ধীরে বন্ধু ধীরে। মাত্র তো এসে পৌঁছালে। একটু জিরিয়ে নাও। তুমি যেহেতু এসে গেছ, সুতরাং শুরু হয়ে গেছে তোমার এভারেস্ট অভিযান। এখন সবকিছুই হবে।

কোমলের অফিস থেকে প্রথম কাজ ছিল রিমিকে ফোন করে জানিয়ে দেয়া যে আমি ঠিকঠাক পৌঁছেছি। রিমি শুধু বললো- সাবধানে থেকো। আমিও তাকে আশ্বস্ত করে বললাম- অবশ্যই।

কোমলকে জিজ্ঞেস করলাম- এই এভারেস্ট আয়োজক প্রতিষ্ঠান হিমালয়ান গাইডস্-এর পরিচিতি কেমন? প্রতিষ্ঠানটার ব্যাপারে শেরপাদের মতামত কি? উত্তরে তিনি বললেন, ?নেপালের অনেক প্রতিষ্ঠানই তিব্বত দিয়ে এভারেস্ট অভিযান আয়োজন করছে। এতে পুরো বিশ্ব থেকে বহু পর্বতারোহীরা এসে যোগ দিচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো চায়না-তিব্বত মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের (সিটিএমএ) সঙ্গে যৌথভাবে এই অভিযান আয়োজন করে। ফলে পুরো আয়োজন অনেকটাই নিরাপদ। এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পর্বতারোহণ তো পুরোটাই পর্বতারোহীর ওপর নির্ভর করে। এসব প্রতিষ্ঠান বা শেরপা- এদের কেউই তো কোলে করে এভারেস্টে উঠিয়ে দিবে না। যা করার পর্বতারোহীই করবে। সেক্ষেত্রে শেরপা ও প্রতিষ্ঠান শুধু সহযোগী। তবে এক্ষেত্রে হিমালয়ান গাইডসের বেশ সুনাম রয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে কতোজন পর্বতারোহী এভারেস্ট অভিযানে যাচ্ছে- শুধু এ সংখ্যার দিক থেকেও যদি বিবেচনা করি, তাহলে খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে হিমালয়ান গাইডস এ মুহূর্তে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর সুনাম রয়েছে দেখেই না পর্বতারোহীরা তাদের সঙ্গে এভারেস্টে যাচ্ছে।?

তার কাছ থেকে এ কথা শুনে আশ্বস্ত হলাম। কোমল অরিয়াল আসলে নেপালের কাঠমাণ্ডুতে বসে আমি যাওয়ার আগ পর্যন্ত সব ঝামেলা সামলেছেন। একে তো অন্নপূর্ণা ফোর পর্বতাভিযানে শেরপাদের বকেয়া বেতন পরিশোধে দেরি হওয়ায় তাদেরকে বুঝিয়ে রাখা এবং সেই অভিযানে ইকুইপমেন্ট শপ-এর মালিককে তার পাওনার ব্যাপারে আশ্বস্ত রাখা, দ্বিতীয়ত এই এভারেস্ট অভিযানের যাবতীয় আয়োজনের দেখভাল করা, কোন প্রতিষ্ঠান আমার জন্য ভালো হবে, শেরপা কে কে এভারেস্ট অভিযানে একেবারে সঠিক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আমার সঙ্গে থাকবে ইত্যাদি সবই কোমল করেছেন তার ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে। নেপালের এই বন্ধু এভাবে চিরদিনের জন্য তার কৃতজ্ঞতার বন্ধনে জড়িয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা- তার সঙ্গে এখন আমার একটা বেশ পারিবারিক সম্পর্ক।

কথা প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেও ফেললেন যে ব্যবসা সামলে তিনি এ অভিযানের সবকিছু দেখভাল করতে গিয়ে এমনও নাকি তার বহু দিন গেছে, যেদিন দুপুরে খাওয়ার কথা ভুলে গেছেন। এ সময় তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, এ কারণেই আপনি কোমল, আমার বন্ধু। তাকে জানালাম- ?এ অভিযানের অর্থ কিভাবে যোগাড় করেছি, তা তো আপনি জানেন। কিন্তু কোন কোন প্রতিষ্ঠান এভারেস্ট অভিযানে স্পন্সর করতে পারে, এটা তো আগেভাগে কেউই জানতাম না। তাই গত দেড় থেকে দু?মাস খুব কম দিনই আমি তোমার মতোই দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করেছি। সকালে নাশতা করে বের হয়ে স্পন্সরের খোঁজে বের হতাম। এরপর একেবারে সন্ধ্যায় গিয়ে আবার খেয়েছি।?

এ কথা শুনে এবার তার চক্ষু চড়কগাছ। বারবারই কোমল বলতে লাগলেন, মুসা বলে কি! সে নাকি গত দেড় মাস দুপুরে না খাওয়া। তাহলে এভারেস্ট অভিযানে যেমন শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা তো মনে হয় মুসার নেই। এবার সোম বাহাদুর যখন বললেন, এটা তেমন কোনো সমস্যা নয়, বেস ক্যাম্পে গিয়ে অ্যাকেম্যাটাইজ করতে পারলেই হলো, তখন কোমল থামলেন।

এদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে এভারেস্ট অভিযান আয়োজক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হলো। তিনি জানালেন, সবকিছু ঠিকঠাক মতো চললে আগামী ১০ এপ্রিল রওয়ানা দিব এভারেস্টের উদ্দেশ্যে। প্রথম গন্তব্য তিব্বতের সীমান্তের ঝাংমু (উচ্চতা ৯,৮০৭ ফুট)।

এরপর গেলাম হোটেলে। সেখানে গিয়ে আমার ব্যক্তিগত পর্বতারোহণ সরঞ্জাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এভারেস্ট অভিযানে আর কি কি কিনতে হবে, তার একটা তালিকা তৈরি করা হলো। এরপর পরদিনের কর্মপন্থা নির্দিষ্ট করে বিদায় নিলেন সোম বাহাদুর আর কোমল অরিয়াল।
  Day 2 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact