Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
16 Apr 2015
মাস্টার্স পাসের দরকার কি!
বাংলাদেশে কিছু ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে রাজধানী শহর, জেলা বা মফস্বল শহর ? সবখানেই বাবা-মা'র প্রধান চিন্তা তাদের সন্তানকে নিয়ে। ছেলেমেয়ের ভালোটা, লেখাপড়া, স্বাস্থ্য, সার্বিক সু-ব্যবস্থাপনা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারে - এ নিয়ে বাবা-মা'র চিন্তার শেষ নাই। বিশেষ করে বাংলাদেশে এই প্যাটার্নের বাইরে এখনও কেউ কিছু চিন্তা করেছেন, এমনটা শুনিনি। এদেশে ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করানো বাবা-মা'র ফরজ কাজ, চাকরি পাইয়ে দিতে পারলে বাবা-মা লা-জওয়াব। আর যদি বাবা-মা বিয়েশাদী করিয়ে দিতে পারেন, তাহলে একেবারে সোনায় সোহাগা।

এহেন তরুণ-তরুণীরা নিজে চাকরি যোগাড় করতে না পারুক, তাই বলে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকবে না, তা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের হাল আমলের ছেলেমেয়েদের এখন কয়েকটি করে ফেসবুক আইডি। পরিসংখ্যান বলে - ৯০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী ফেসবুক ব্যবহার করেন। পরিসংখ্যান আরো বলে, বিশ্বে যতো ফেসবুক ব্যবহারকারী আছেন, তাদের মধ্য থেকে বাংলাদেশীরা যেকোনো বিষয়ে ফেসবুকে বেশি ক্রিয়াশীল (অ্যাকটিভ) থাকেন। জনপ্রিয় পেইজ বা বিষয়ে বাংলাদেশীরা বেশি ?লাইক? মারেন। ফেসবুকটাকেই বাংলাদেশের মানুষ উৎকর্ষতা (ক্রিয়েটিভিটি) দেখানোর সবচেয়ে ভালো জায়গা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। ফেসবুক না থাকলে এদেশের মানুষের বুদ্ধিশুদ্ধি কি ভোতা হয়ে যেত? কয়েকদিন আগে এটাও স্ট্যাটাসে দেখা গেল- এক বাবা তার দুধের বাচ্চাকে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছেন। অর্থাৎ লেখাপড়া করানো, চাকরি পাইয়ে দেয়া কিংবা বিয়ে-শাদী দেয়ার পাশাপাশি বাবা-মা?র এখন একটা বাড়তি দায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়েছে ? বাচ্চার জন্য ফেসবুক অ্যাকাউন্টও খুলে দেয়া। সেই বাচ্চা যখন কি-বোর্ড চেপে দুর্বোধ্য সব শব্দ তৈরি করে, সেই শব্দমালায় বিদগ্ধ ফেসবুকবাসী নানা সরেস মন্তব্য করেন। সেই মন্তব্য পড়ে "আহা! আমাদের বাচ্চা তো মাশাল্লাহ অনেক ক্রিয়েটিভ" - এমন ভাবনাই বাবা-মা'র আনন্দ। প্রতিযোগিতার বাজারে তাদের বাচ্চা এক দিন আগে হলেও ফেসবুক ব্যবহার শুরু করেছে, বাহারে! বাহারে!

এই বাচ্চাই বড় হয়। স্কুলে যাওয়া শুরু করে। বাবা-মা'র স্বপ্নগুলোও ডানা মেলতে শুরু করে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে সেই সন্তান যখন চাকরির বাজারে নিজেকে যোগ্য করে তোলে, তখনও বাবা-মা'র কোল ছাড়ে না। মাস্টার্স পাস করে গেছে, তখনও ফেসবুকে স্ট্যাটাসে থাকে - লিভিং ইন বাপের হোটেল কিংবা বেকার অ্যাট বাপের হোটেল। এই হলো মাস্টার্স পাসের নমুনা। নিজের যোগ্যতায় একটা চাকরি বা কাজ জোটানোর মতো যোগ্যতাই যদি তৈরি করতে না পারি, তাহলে এই মাস্টার্স পাস করার দরকারটা কি? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই যোগ্যতা অর্জন করা হয় না দেখেই মাস্টার্স পাস ছেলেমেয়ের দপ্তরীর চাকরির আবেদনে প্রয়োজন হয় চাচা-মামা-খালু-এমপি-মন্ত্রী'র সুপারিশ। এ এক গোলকধাঁধা। এমপি-মন্ত্রীর কাছে এই মাস্টার্স পাসধারীরা চরকি ঘোরা ঘোরে, অথচ এই নীতিনির্ধারকরা শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে এদেরকে কর্মমুখী শিক্ষায় অভ্যস্ত করে তোলেন না। কর্মমুখী শিক্ষায় অভ্যস্ত হলে এমপি-মন্ত্রীর কাছে আর যাবেই বা কে? কাজেই সাত মণ ঘি?ও পোড়ে না, রাধাও নাচে না। নীতিনির্ধারকরাও কর্মমুখী শিক্ষা চালু করেন না।

আমেরিকা-ইউরোপে ছেলেমেয়েরা সেভেনথ বা এইটথ গ্রেডে থাকতেই নিজে উপার্জন করার নানা পদ্ধতির সঙ্গে অভ্যস্ত হতে শেখে। হয় কোনো ফাস্ট ফুডের দোকান, বা চেইন শপ, সুপার শপ, লাইব্রেরি, কার ওয়াস ? ইত্যাদি হেন কোনো কাজ নেই, যার সঙ্গে এই ছেলেমেয়েদেরকে পরিচিত করে তোলা হয় না। কায়িক শ্রমকে সেখানে ঘৃণার চোখে কখনোই দেখা হয় না। কায়িক শ্রমকে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবে কখনোই হেয় করে মানুষের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি সেখানে। এমনটাও শুনলাম ? বিত্তশালী বাবা ?ল্যাম্বরঘিনি? গাড়ি হাঁকিয়ে এসে মেয়েকে ম্যাকডোনাল্ডসে নামিয়ে দিয়ে যান। আবার কাজ শেষের সময় হলে সেই গাড়িতে করে তুলে বাসায় ফেরেন। এর উদ্দেশ্য? ছেলেমেয়ে অঢেল সম্পদের মধ্যে থেকে যেন আবার কায়িক শ্রমকে ঘৃণা করতে না শেখে; নিজে অর্থ উপার্জন করার প্রতি অনীহা তৈরি না হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা আছে? আছে কি এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা? আমাদের ক্লাস এইট-নাইনপড়ুয়া বাচ্চারা নিজে কাজ করে উপার্জন করছে ? এই মানসিক প্রস্তুতি আমাদের কতোখানি আছে?

বাংলাদেশে থাকলে একরকম। আবার বিদেশে অভিবাসী হয়ে গেলে মনমানসিকতা অন্যরকম হয়ে যায়। প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিন্তা করতে শেখেন এই বাংলাদেশীরাই। আমেরিকায় যেমন এক প্রবাসী বাংলাদেশী বলছিলেন ? ছেলেমেয়ের শিক্ষা বা ভরণপোষণের দায়িত্ব তাদের আঠার বছর বয়স পর্যন্ত। এরপর ছেলেমেয়ে নিজের দায়দায়িত্ব নিজে বুঝে নিবে। তখন তিনি ঝাড়া হাতপা হয়ে গেলে যেখানে খুশি সেখানে ঘুরে বেড়াবেন, যা খুশি করবেন। অবশ্য ছেলেমেয়েকে তিনি সেই সমাজে বাসের যোগ্য করতে যা যা শেখানো প্রয়োজন, যেসব সুযোগ-সুবিধা দেয়া প্রয়োজন, তা তিনি করবেন্। আমেরিকাতেই গত বছর লেখাপড়া করতে গেছেন, এমন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি যোগাড়ের জন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করছেন ? একটা প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে। তাহলে কি এদেশের মাটি, বায়ু, পানি?ই তরুণ-তরুণীদের স্বতস্ফূর্তভাবে কর্মবিমুখ করে তোলে? যা কি না ঠিক উল্টোটাই ঘটে বিদেশে গেলে?

তবে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও যেমন ধান বানে, তেমনি বিদেশে গেলেও অনেক বাংলাদেশীকেই দেখেছি যে তারা সেখানকার ভালো দিকগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারেন না। তাদের অভ্যাসের ফলে বাচ্চারাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে না। বাংলাদেশের মতোই এক ধরনের ?ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স? নিয়ে বড় হতে থাকে। অস্ট্রেলিয়াতেও সেদেশী লোকজন বাচ্চাকাচ্চাদেরকে একেবারে শুরু থেকেই নিজের কাজ নিজেই করতে শেখান। ফলে বাচ্চাকাচ্চারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বড় হতে থাকে। কিন্তু সেদেশে এক প্রবাসী বাংলাদেশী মা?কে দেখলাম, তিনি তার বাচ্চাকে খোদ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় এটা কোরো না, ওটা করছো কেনো ? ইত্যাদি নানা বাক্যে ধমক দিচ্ছেন। আর তার মেয়েশিশুটা বারবারই স্বতস্ফূর্ততা হারিয়ে মনে মনে যে কুকড়ে যাচ্ছে, তা তার চেহারাতেই ফুটে উঠছে। বাংলাদেশে তো বাচ্চাদের শাসন করা এক ফরজ কাজেরই নামান্তর। এজন্য প্রবাদও তৈরি করা হয়েছে ? কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে টাস টাস। অর্থাৎ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, আমাদের সামাজিক কাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যেন বাচ্চাদের ঘরে পুরে রাখার একটা অলিখিত সংবিধানের বেড়াজালে আটকে রেখেছে। অবশ্য এর ফলটা তো পেতেই হয় ? এখনকার বাচ্চারা আছে ফেসবুক নিয়ে, ঠিক তাদের আগের জেনারেশনটা আছে বাপের হোটেলে। ফলে চাকরি বা কাজের জন্য তাদের পাশাপাশি বাবা-মা?ও সমানুপাতিক হারে টেনশন করেন। অথচ বাংলাদেশে যারা সফল, কি বিদ্যায়, বিজ্ঞানে, খেলাধুলায়, ব্যবসাবাণিজ্যে ? খুব বেশি ব্যতিক্রম ছাড়া এই সফলদের শিশুকালটা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তারা গতানুগতিকতার বাইরে কিছুটা স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পেরেছিল, কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাসী হয়ে বড় হয়েছিল বলেই তারা সফল।

একটা দেশ আগামী এক বছর কেমন করে পরিচালিত হবে, তার পুরো প্রতিফলন কিন্তু আর্থিক বছরের শুরুতে যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়, তাতেই থাকে। বড় কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে এই পরিকল্পনাতেই দেশটা পরিচালিত হয়। শিক্ষাক্ষেত্রেও তাই। শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ, শিক্ষা নীতিমালা এবং স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমই (কারিকুলাম) বলে দেবে যে সেদেশের শিক্ষার্থীরা কি শিখবে, দেশের কোন ধরনের জনশক্তির চাহিদা তারা পূরণ করবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শুরু থেকেই এই কর্মমুখী, কারিগরি এবং মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষা উপেক্ষিত থেকেছে। ফলে দেশে প্রতিবছর গ্রাজুয়েট পাস তরুণের সংখ্যা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সুস্থ-স্বাভাবিক-মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন, কর্মস্পৃহাময়, উদ্যোগী, কায়িক শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল টগবগে তরুণ পাওয়া ইদানিং প্রায় আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে, তারা বাংলাদেশের আলো-বাতাস-মাটি-পানিতে বড় হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তারা বিশ্ব পরিবারের অংশ। প্রযুক্তি, শিক্ষা ইত্যাদির কাছে দেশের সংজ্ঞা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। কাজেই আমাদের শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের হতে হবে, বিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে হবে, নিজেদের মধ্যে বিশ্ব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সামর্থ, দক্ষতা ও জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে। আরেকটা ব্যাপার মনে রাখা ভালো ? ফেসবুক একটা যোগাযোগ মাধ্যম। এই মাধ্যম ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের যে কাজ, শিক্ষায় যোগাযোগটা বাড়ালেই মনে হয় ভালো হয়, অযথা ফেসবুকসেবী না হয়ে। বাবা-মা?র কাছেও বলা ? শিশুর জন্য ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলার চেয়ে একটা ?সোশ্যাল কম্পিটেন্সি লিস্ট? তৈরি করুন। এরপর দেখুন আপনার সন্তানটি এ সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য কোন কোন যোগ্যতা অর্জন করলো, আর কোনটি বাকি থাকল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ তিনটি দেশ বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করবে ? ব্রাজিল কৃষিখাত দিয়ে, চীন শিল্প দিয়ে এবং ভারত দক্ষ জনশক্তি দিয়ে। আমাদের যে জনসংখ্যা রয়েছে, যে উর্বর কৃষিজমি রয়েছে, তা দিয়ে বাংলাদেশ কৃষিজাত পণ্য এবং দক্ষ জনশক্তি দিয়ে এই মিছিলে শামিল হতে পারে। এজন্য যে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যেভাবে কর্মমুখী এবং কারিগরি শিক্ষাসহকারে সাজানো প্রয়োজন, তার উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। নাহলে প্রতিবারই আমরা অনুভব করবো ? আহা, ট্রেনটা মিস হয়ে গেল। ইতিমধ্যে বহু ট্রেন আমরা মিস করেছি। কিন্তু আগামীতে আরো সুযোগ হেলায় হারানোর মতো বিলাসিতা করার মতো অবস্থা বাংলাদেশের কি আসলেই আছে?
Write Comment Please Login
If you have something to say or share, blog is the right place for you. You don't need to be a BLOG member to contribute.
Please register here. It's Free!!
Username
Password
Forgot login info?
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact