Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 2
নতুন মহাদেশে, নতুন সংস্কৃতিতে আরেকটি পর্বতাভিযান
সোমবার (১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১২), বুয়েন্স আইরেস, আর্জেন্টিনা

আর্জেন্টিনার অ্যাকঙ্কাগুয়া পর্বতাভিযানের জন্য ঢাকা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় কাতারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি কাতার এয়ারলাইন্সে। প্লেন ছয় ঘণ্টায় নামিয়ে দিয়েছে দোহা এয়ারপোর্টে। কাতারের সময় বাংলাদেশের চেয়ে তিন ঘণ্টা পেছনে। ফলে কাতারে পৌঁছাতে যেখানে রাত দেড়টা বাজার কথা, প্লেন দোহার মাটি ছুঁলো স্থানীয় সময় রাত সাড়ে দশটায়। সময়ের এই সামান্য হেরফের সহ্য করে নেয়ার ক্ষমতা শরীরের আছে। কিন্তু নয় ঘণ্টা হেরফের হলে? হ্যাঁ। বাংলাদেশ আর্জেন্টিনার চেয়ে নয় ঘণ্টা অগ্রগামী। তার মানে যদিও এখন (মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি) এই মুহূর্তে বাংলাদেশে স্থানীয় সময় সকাল ৯টা। কিন্তু সময়ের ফারাকের কারণে এবং আর্জেন্টিনা বিশ্বের প্রায় সর্বপশ্চিমের দেশ হওয়ায় দেশটির স্থানীয় সময় এখন সন্ধ্যা ৬টা (সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি)।

কাতার থেকে সকাল সাড়ে সাতটায় রওয়ানা দিয়ে প্রায় বারো ঘণ্টা ক্রমাগত পশ্চিমে দিকে আকাশপথে ভ্রমণ করে ব্রাজিলের সাও পাওলো?য় পৌঁছেছি। ব্রাজিলের যাত্রীদের নামানো এবং আর্জেন্টিনার যাত্রীদের তুলে নেয়া? এতে সাও পাওলোতে প্লেন যাত্রাবিরতি করলো প্রায় এক ঘণ্টা। এবার দক্ষিণে দিকে প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা উড়ে প্লেন আমাদের সবাইকে নামিয়ে দিয়েছে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেস-এ। সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে দোহা, সাও পাওলো হয়ে বুয়েনস আইরেস পর্যন্ত দূরত্ব পাড়ি দিয়েছি প্রায় ১৭,৪২২ কিলোমিটার। আর এশিয়া থেকে আফ্রিকা মহাদেশ ও আটলান্টিক মহাসাগড় পাড়ি দিয়ে চলে এসেছি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে। তাই এখন সময়ের এতোখানি হেরফের শরীর কোনোভাবেই মানতে চাইছে না। শরীর ক্লান্ত হলেও ফলে আর্জেন্টিনায় যেখানে প্রায় মাঝরাত, যে সময়ে সবাই ঘুমে গড়াগড়ি খাচ্ছে, আমি একা বসে বসে অ্যাকঙ্কাগুয়া অভিযানের ডায়েরি লিখছি।

প্লেনে ভ্রমণটা আজকে যাচ্ছেতাই হলো। বিশেষ করে দোহা থেকে। কারণ টানা প্রায় পনের ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে প্লেনের মধ্যে। বেশ ক্লান্তিকর। প্লেনের ভেতরে ইনফরমেশন স্ক্রিনে তাই কিছুক্ষণ পরপর মেসেজ ভেসে আসছিল? একটানা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে হাত-পা ও শরীর নাড়াচাড়া করুন। আর এদিন প্লেন বেশ ঝাঁকুনি খেল। পাইলট শুধু দোহা থেকে ওড়ার আগে ?এয়ার টার্বুলেন্স?-এর সময় সিট বেল্ট বেধে বসে থাকার অনুরোধ করলেন। কিন্তু এর পর সাও পাওলো পর্যন্ত এ নিয়ে তার আর কোনো কথা শুনলাম না। হয়তো এই এয়ার টার্বুলেন্সই এ রুটে স্বাভাবিক। তাই পাইলট এ নিয়ে কোনো ঘোষণা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। যাত্রীদের মধ্যেও এ নিয়ে তেমন কোনো উত্তেজনা দেখা গেল না। হয়তো তারাও মেনে নিয়েছেন বিষয়টা।

ঘটনাটা হলো কাতার থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত রুট পুরোটাই পশ্চিমে। কিন্তু গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার ফ্টু উঁচুতে উড়তে গিয়ে প্লেন বারবার আড়াআড়িভাবে বয়ে চলা জোরালো বাতাসে ক্রমাগত ধাক্কা খেয়েছে। ফলটা হলো মাঝেমধ্যেই প্লেনের মধ্যে বিরক্তিকর একটানা ঝাঁকুনি।

সাও পাওলো এয়ারপোর্টে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু বুয়েনস আইরেস-এ একেবারে ঝকঝকে আকাশ। এর মধ্যেই প্লেন বুয়েনস আইরেস-এর মাটি স্পর্শ করার পর যাত্রীদের কাণ্ডে নিয়াজ আর আমি অবাক। প্লেন মাটি স্বর্শ করা মাত্র যাত্রীরা সবাই হাততালি দিয়ে উঠলেন। অভিযানসঙ্গী নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারি ব্যাখ্যা দিলেন- উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে এই চলটা রয়েছে। পাইলট সফলভাবে প্লেন চালানোর জন্য প্রশংসাস্বরূপ এটা করা হয়।

এখানে তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অনেকটা বাংলাদেশের মতোই। তবে মাত্রাতিরিক্ত আদ্রতা নেই বাতাসে। তাই এয়ারপোর্টের বাইরে দুলকি চালে বয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা বাতাসটা বেশ উপভোগ্য।

বুয়েনস আইরেসের এজাইজা এয়ারপোর্ট থেকেই মেনডোসা শহরের এয়ার টিকেট সংগ্রহ করা হলো। এই বুদ্ধিটা নিয়াজ ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করেছেন। যাত্রাপথে অনেকেই পরামর্শ দিলেন এজাইজা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে চেপে বুয়েনস আইরেসের আভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর অ্যারোপার্ক জর্জ নিউবেরি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে মেনডোসায় যাওয়ার প্লেন টিকেট সংগ্রহ করার। কিন্তু এজাইজা আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট থেকে সকাল দশটায় একটা ফ্লাইট মেনডোসা ছেড়ে যায়। যদিও সেটা আভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। নিয়াজ এটা খুঁজে বের করাতে এজাইজা এয়ারপোর্ট থেকে অ্যারোপার্ক এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ন্যূনতম বাসের ভাড়া জনপ্রতি ত্রিশ ডলার এবং সেখানে হোটেলে থাকার ভাড়া জনপ্রতি ন্যূনতম একশ ডলার করে প্রায় অনেকটা খরচা বেঁচে গেল।

আজ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ?ভ্যালেন্টাইন্স ডে?। এ ধরনের যেকোনো দিনে তরুণ-তরুণীরা প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে বের হয়ে পড়েন। ঢাকায় এই চলটা আরও বেশি। আর এ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সবাই সেজেগুজে বের হন। বই, ফুল ইত্যাদি দিয়ে প্রিয়জনকে শুভেচ্ছা জানান। কিন্তু এই ১৩ ফেব্রুয়ারিতেই আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস বিমানবন্দরে প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে, চুমু দিয়ে বিদায় জানাচ্ছেন। এখানে ভালোবাসার কোনো বয়স নেই, কোনো জাত নেই, কোনো সময় নেই। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা সবাই তাদের অনুভূতি প্রকাশে স্বচ্ছন্দ। কিন্তু বাংলাদেশে ভালোবাসা জানানোর জন্য বিশেষ দিন প্রয়োজন। সেটাকেও আবার কর্পোরেট দুনিয়া তাদের ব্যবসার অন্যতম মাধ্যম করে নিয়েছে। ভালোবাসা বাংলাদেশে পণ্যের মাধ্যমে বিকশিত, ঘরে আবেগ এখন সেকেলে বস্তু।

এভাবেই দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের আর্জেন্টিনায় শুরু হয়ে গেল প্রথম দিন। প্লেন থেকে বুয়েনস আইরেসে নামতেই বুঝতে পেরেছি ইংরেজি?র তেমন কোনো কদর এখানে নেই। শতকরা ৯৯ভাগ ক্ষেত্রেই স্প্যানিশ আওড়াচ্ছেন সবাই। ফলে এয়ারপোর্টে দোকানে কোনো জিনিস কিনতে গিয়ে নিয়াজ এবং আমি যেই না ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করছি যে অমুক বস্তুটা আছে কি না, বেশিরভাগ মানুষ বুঝতে না পেরে এক শব্দে উত্তর জানাচ্ছেন ?নো?। তাদের ইংরেজি?র চল এতোখানি। অথচ একটু যাচাই করতেই দেখা গেল সেই পণ্যটাই সেই দোকানে বেশ শোভা বাড়াচ্ছে। এ সময় ভাবছি দেশে কিছুদিন চলনসই স্প্যানিশ শিখে নিলেই ভালো হতো।

আর্জেন্টিনার মাউন্ট অ্যাকঙ্কাগুয়া অভিযানে স্পন্সর করছে কাতার এয়ারওয়েজ, কম্পিউটার সোর্স, ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেড, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, কোহিনূর কেমিকেলস ও সুরভি এগ্রিকালচার। দৈনিক ইত্তেফাক এই অভিযানের অন্যতম সহযোগী।

গত ২৬ নভেম্বর ২০১০ তারিখে এভারেস্ট পর্বতাভিযানের ছবিগুলো নিয়ে ঢাকার অঁলিয়স ফ্রসেস-এ ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধনের সময় আমার পরবর্তী লক্ষ্য বাংলাদেশ থেকে সেভেন সামিট অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলাম। সেভেন সামিট হচ্ছে বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বতচূড়ায় অভিযান। গত ২৩ মে ২০১০ তারিখে বাংলাদেশকে ৬৭তম এভারেস্টজয়ী দেশে পরিণত করেছি অবশ্য সেভেন সামিটের কথা মাথায় না রেখেই। তখন চিন্তাটা ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া এভারেস্টে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়াতে হবে। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এর পরপরই পর্বতাভিযানে বাংলাদেশকে আরেকটি উচ্চতায় নিয়ে যেতে সেভেন সামিট অভিযানে নামার পরিকল্পনা করেছি।

এর পর বহুদিন পার হয়ে গেছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১১ তারিখে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত ১৯,৩৪০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট কিলিমানজারো জয় করে নিয়াজ ও আমি সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি। এরপর পরবর্তী লক্ষ্য দক্ষিণ মেরুর মাউন্ট ভিনসন থাকলেও সময়মতো বুকিং দিতে না পারায় সেই অভিযানে যাওয়া হলো না। তাই দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বত আর্জেন্টিনা ও চিলি সীমান্তে অবস্থিত অ্যান্ডিজ পর্বতমালার মাউন্ট অ্যাকঙ্কাগুয়ায় (উচ্চতা ২২,৮৪১ ফুট) পরবর্তী টার্গেট নির্ধারণ করে অভিযানে বের হয়ে পড়েছি। সঙ্গী হয়েছেন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়াজ।

এজাইজা এয়ারপোর্টে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক কাটানোর পর নিয়াজের হুশ হলো যে তার একটা ব্যাগ সংগ্রহ করার কথা আমরা বেমালুম ভুলে গেছি। ভাগ্যিস এজাইজা এয়ারপোর্ট ছেড়ে মূল শহরে অ্যারোপার্ক এয়ারপোর্টে চলে যাই নি। গেলে আজ বাসে যাওয়া-আসা করতে করতেই সময় পার হয়ে যেত। এবার এজাইজা এয়ারপোর্টের ?সি ব্লক? থেকে ?এ ব্লক?-এ ফিরে গিয়ে এয়ারপোর্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টা জানাতেই তারা পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিয়াজের হারানো ব্যাগ খুুঁজে দিলেন। তাদের ভাষ্যমতে- নিয়াজ নির্দিষ্ট বেল্ট থেকে ব্যাগটা সংগ্রহ না করাতে তারা সেটা ?লেফট লাগেজ সেকশন?-এ রেখে দিয়েছেন। যারা এ ধরনের ভুল করছেন, তাদেরকে সহজ ও দ্রুত সেবা দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য। এ সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্তুপ হয়ে থাকা বাক্সপেটরা থেকে জিনিসপত্র চুরি হওয়ার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার কথা মনে পড়ল। বিষয়টা এতটাই নৈমিত্তিক আর গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে যে সাংবাদিকরা পর্যন্ত এটা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। হায়রে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর!

এরপর রাতের খাওয়া শেষে এজাইজা এয়ারপোর্টের মেঝেতেই ঘুমাতে গেলাম বহু যাত্রী।
« Day 1 
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact