Facebook   Twitter   LinkedIn   Youtube   Wikipedia
Day 1
অ্যাকঙ্কাগুয়ায় ওড়াবো লাল-সবুজ পতাকা
রোববার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

ঢাকার গ্রিন রোডের শ্বশুরবাড়ি থেকে বের হতে গিয়েই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এমন নয় যে এবারই প্রথম আমি শিশুপুত্র (ওয়াসী ইব্রাহীম) রাইদকে রেখে পর্বতাভিযানে যাচ্ছি। কিন্তু রাইদের কাছ থেকে বিদায় নেয়াটা আগের মতো সহজ হয় না। কেমন যেন একটা টান অনুভব হতে থাকে। বারবার মনে হয় যেন বুকের ধনকে রেখে যাচ্ছি কোন অজানা দেশে। সেটা আবার প্রকাশ হলো। মুখে কপট হাসি চেপে তাকে বললাম, বাবা, আমি তো এভারেস্টে যাচ্ছি (রাইদের কাছে পাহাড় মানে হলো এভারেস্ট)। তুমি বাসায় মম-এর সঙ্গে থেকো। অনেক খেলা কোরো, অনেক বই পড়িও, অনেক দুষ্টামি করিও। সে সানন্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। এক ফাঁকে আমি বের হয়ে পড়ি। শ্বাশুড়ি সেহেলি হক দোয়াদরূদ পড়ে বিদায় জানালেন।

গত ২৬ নভেম্বর ২০১০ তারিখে এভারেস্ট পর্বতাভিযানের ছবিগুলো নিয়ে ঢাকার অঁলিয়স ফ্রসেস-এ ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধনের সময় আমার পরবর্তী লক্ষ্য বাংলাদেশ থেকে সেভেন সামিট অভিযানের ঘোষণা দিয়েছিলাম। সেভেন সামিট হচ্ছে বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ পর্বতচূড়ায় অভিযান। গত ২৩ মে ২০১০ তারিখে বাংলাদেশকে ৬৭তম এভারেস্টজয়ী দেশে পরিণত করেছি অবশ্য সেভেন সামিটের কথা মাথায় না রেখেই। তখন চিন্তাটা ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া এভারেস্টে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়াতে হবে। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এর পরপরই পর্বতাভিযানে বাংলাদেশকে আরেকটি উচ্চতায় নিয়ে যেতে সেভেন সামিট অভিযানে নামার পরিকল্পনা করেছি।

এর পর বহুদিন পার হয়ে গেছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১১ তারিখে আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত ১৯,৩৪০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট কিলিমানজারো জয় করে নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারি ও আমি সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি। এরপর পরবর্তী লক্ষ্য দক্ষিণ মেরুর মাউন্ট ভিনসন থাকলেও সময়মতো বুকিং দিতে না পারায় সেই অভিযানে যাওয়া হলো না। তাই দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বত আর্জেন্টিনা ও চিলি সীমান্তে অবস্থিত অ্যান্ডিজ পর্বতমালার মাউন্ট অ্যাকঙ্কাগুয়া (উচ্চতা ২২,৮৪১ ফুট) অভিযান পরবর্তী টার্গেট নির্ধারণ করে আজ বের হয়ে পড়লাম। সঙ্গী হলেন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারি।

রাইদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়াম। সেখানে বাংলাদেশ প্রিমিয়র লিগের খেলা চলছে। খুলনা রয়াল বেঙ্গলসের আমি আবার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। কাজেই পুরো দলকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে মাঠে যেতেই হবে। আমরা এভারেস্ট চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলাম যে মনোবল, সাহস আর দৃঢ় প্রত্যয়কে সঙ্গী করে, সেই উদ্দীপনা ও মোটিভেশন যাতে খুলনা রয়াল বেঙ্গলস দলের সদস্যদের সঙ্গী হয়, সেটাই ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসাবে আমার দায়িত্ব। এটা তো গেল মাঠের বাইরের কথা। মাঠে খেলবে পুরো পেশাদার ক্রিকেটাররা। ক্রিকেট বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান খুলনা দলের ক্যাপ্টেন। তার নেতৃত্বে দলে দেশবিদেশের নামীদামী ও খ্যাতিমান ক্রিকেটাররা খেলছেন। কিন্তু চট্টগ্রাম কিংসের সঙ্গে খেলায় এদিন প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ২০ ওভারের মাঝপথে দল যেন সামান্য হলেও খেই হারিয়ে ফেলে। তারপরও ১৭১ রান একটা ফাইটিং স্কোর। কিন্তু পরে চট্টগ্রাম কিংসের ব্যাটসম্যানরা প্রথম সাত ওভারের মধ্যেই ম্যাচটিকে খুলনার আয়ত্তের বাইরে নিয়ে চলে যায়। তবে প্রথম ম্যাচে ঢাকা গ্লাডিয়েটরসকে হারানোর সুখস্মৃতি তাতে অম্লান হয় না। কারণ পুরো লিগে এখনো ৮ ম্যাচ বাকি। এই ম্যাচগুলোতে ভালো পারফর্ম করেই দল সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে যাবে, এটা বলেই ম্যাচ শেষে অফিসিয়ালদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করলাম। তাতে কাজ হলো। একটা ব্যালান্সড দল হিসাবে ফাইনালে খেলার যোগ্যতা যে রাখে খুলনা রয়াল বেঙ্গলস, সেই বিশ্বাস আমার আছে। সেই আত্মবিশ্বাসটা এখন দলের ক্রিকেটাররা মাঠে করে দেখাতে পারলেই হয়।

ম্যাচ শেষে সোজা নিজের বাসায়। আম্মা আমার আর্জেন্টিনাযাত্রা উপলক্ষে বহু কিছু রান্না করেছেন। কিন্তু সময় স্বল্পতায় সেসব কিছুই মুখে তোলা গেল না। শুধু একটা মাছের বড়া খেতে খেতে ব্যাগ পিঠে চাপিয়ে বোন নূর আয়েশা ও আম্মার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। আব্বা সেই যে সকালে কাজে বাসা থেকে বের হয়েছেন, তিনি তখনো ফেরেন নি। তাই ফোনেই তাকে আর্জেন্টিনাযাত্রার খবরটুকু জানালাম। তিনি সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়ে নিরাপদে ফেরার ব্যাপারে তাগিদ দিলেন।

সেই তাগিদটা আমার নিজের মধ্যেও আছে। পর্বতারোহণে ?সেফটি ফার্স্ট?। ২০০৪ সালে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে এক মাসব্যাপী বেসিক মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করার সময় বিশ্বের প্রথম এভারেস্টজয়ী তেনজিং নোরগের শ্যালক নিমা নোরবু। তার মতে, যদি আজ তুমি কোনো কারণে পর্বতে তোমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পার, তাহলে ফিরে এসে আগামীকাল আবার চেষ্ট করো। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছাতে গিয়ে নিজেকে শেষ করে ফেললে তুমিই হারিয়ে গেলে, পর্বত কিন্তু তার নিজের জায়গাতেই থেকে যাবে। তার এই কথাটা বহু দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও তার এ কথার বহু প্রয়োগ খুঁজে পেয়েছি।

বাসায় চূড়ান্তভাবে ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে একটা ট্যাক্সিতে চেপে বসতেই বাংলা চ্যানেল সাঁতারু লিপটন সরকার সঙ্গী হলেন। সবাইকে অবাক করে মিরপুরের মাটিকাটা থেকে মাত্র ১৫ মিনিটে ট্যাক্সি আমাদের হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে দিল। জ্যামের শহর ঢাকায় এটা এখন অলীক একটা ব্যাপার। নিয়াজ আগেই সেখানে পৌঁছে স্বাগত জানালেন।

বিমানবন্দরে এয়ারলাইন্সে আনুষ্ঠনিকতা সারতেই যেই না ইমিগ্রেশনে গিয়েছি, একজন ইমিগ্রেশন পুলিশ কর্মকর্তার মন্তব্যে হতাশ হতে হলো। তার সঙ্গে কথোপকথনের চুম্বক অংশটুকু ছিল এমন:
- কোথায় যাচ্ছেন?
- আর্জেন্টিনা।
- কেন যাচ্ছেন?
- পাহাড়ে চড়তে।
- পাহাড়ে? এটা একটা কাজ হলো না কি?
তার এ কথা শুনে নিয়াজ ও আমি তখন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। ভাবছিলাম যে বাংলাদেশকে এভারেস্টজয়ী দেশে পরিণত করার পরও এ দেশের মানুষ কিভাবে পর্বতারোহণ সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করেন?

বিষয়টা এখানে শেষ হলেও হতো। তিনি আরও অবাক করে এবার তিনি পাসপোর্ট ও আমাকে নিয়ে উর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে চললেন। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনো সমস্যা? তিনি উত্তরে বললেন, ?সমস্যাই তো। আপনি এই প্রথম ইউরোপ ভ্রমণ করছেন (অর্থাৎ আর্জেন্টিনা ইউরোপভুক্ত একটা দেশ! হায়রে ইমিগ্রেশন পুলিশ কর্মকর্তার ভূগোল জ্ঞান)। এটা উর্ধ্বতন পুলিশ অফিসারকে জানানো আমার দায়িত্ব।?

তাকে এবার বলতেই হলো, দেখুন, আমার নাম মুসা ইব্রাহীম। আমরা পর্বতারোহণে যাচ্ছি, আর্জেন্টিনায়।
তখনো আরও বিস্ময়ের বাকি ছিল। তিনি বলেই চলেছেন, হুমম। কিন্তু আপনি তো ওনার (নিয়াজ মোরশেদ পাটওয়ারী) মতো আগে কখনো ইউরোপ ভ্রমণ করেননি। আর ওনার পাসপোর্টে বেশ কয়েকটা ইউরোপের ভিসা আছে, তাই ওনাকে একবারেই ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু আপনাকে তো তা করতে পারি না। তাই উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে আমাকে জানাতেই হবে।

তাকে বললাম, ঠিক আছে। আপনার দায়িত্ব, পালন করুন। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তাটি অবশ্য একেবারেই চিনলেন। আর দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাকে বললেন, উনি মুসা ইব্রাহীম। উনি কোথায় যাবেন, এটা তার ব্যাপার। আপনি তাকে আটকে রেখেছেন কেন?
তাতেও হুশ হয় না সেই কর্মকর্তার। তিনি জিজ্ঞেস করেই চলেন, আচ্ছা, আপনি আর্জেন্টিনার ভিসা কোথা থেকে নিয়েছেন? দিল্লি থেকে? আর কথা না বাড়িয়ে এবার শুধু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম।

এবার ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে কর্মকর্তাটি ছেড়ে দিলেন। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বোর্ডিং লাউঞ্জের দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখানে কাতার এয়ারওয়েজের কর্মকর্তারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কাতার এয়ারওয়েজ আমাদের অ্যাকঙ্কাগুয়া পর্বতাভিযানের টিকেট স্পন্সর। এজন্য তাদের পতাকা নিয়ে লাউঞ্জে ছবি তুলতে হবে। এসব সেরে বিমানবন্দরের বহু দায়িত্বরত লোকজনের শুভকামনা নিয়ে এগিয়ে চলেছি এয়ারক্রাফটের দিকে।

আর্জেন্টিনার মাউন্ট অ্যাকঙ্কাগুয়া অভিযানে আরও স্পন্সর করছে কম্পিউটার সোর্স, ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেড, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, কোহিনূর কেমিকেলস ও সুরভি এগ্রিকালচার। দৈনিক ইত্তেফাক এই অভিযানের অন্যতম সহযোগী। সবকিছু ঠিক থাকলে ১২ ফেব্রুয়ারি কাতারের দোহা এয়ারপোর্ট হয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত দশটায় আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেস-এ গিয়ে পৌঁছাব। সেখান থেকে মাউন্ট অ্যাকঙ্কাগুয়ার কাছাকাছি আর্জেন্টিনার আরেকটি শহর মেনডোজা?র প্লেনে চাপতে হবে।
  Day 2 »
Welcome Message
Mountaineering Biography
Personal Biography
Photo Gallery
Video Gallery
Musa Ibrahim's official website (www.musaibrahim.com.bd) launched on December 03
DU authority conferred 'Blue' award to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim accorded DU Alumni Association reception
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Institute of Education & Research (IER), University of Dhaka is conferring reception to Musa Ibrahim
Musa Ibrahim's photo exhibition titled 'Bangladesh on top of the Everest'
Home About Musa Gallery You can do it Press Release Blog Forum FAQ Contact